ভ্যাট ও ট্যাক্স ফাঁকির মহোৎসবে বেঙ্গল বিস্কুট লিমিটেড, কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করতে বিল পাস
ইবাংলা.প্রেস | নিজস্ব প্রতিবেদক | ২৯ জুলাই ২০২৫
বেঙ্গল বিস্কুট লিমিটেড এখন টিভি’র মাধ্যমে প্রচার করে বেড়াচ্ছেন যে, তারা তাদের পণ্য প্রতি মাসে ৬ থেকে ৭ কোটি টাকার উৎপাদন ও বাজারজাত করেন এবং শ্রমিকদের মাসে ১০ হাজার টাকা বেতন প্রদান করে থাকেন। বিজ্ঞাপনের আলোকে অনুমান করা যায় কোম্পানির কোন পন্যের উৎপাদন, বাজারজাতকরণ কিংবা শ্রমিকদের বেতন প্রকাশ্যে আনা মানেই হল কোথাও না কোথাও গাফিলতি আছে। অনেকটা ভয় থেকে আবোল তাবোল বলার মত।
এ নিয়ে কোম্পানির সাবেক এক কর্মকর্তা (নাম প্রকাশ না করার শর্তে) জানান, বেঙ্গল বিস্কুট লিমিটেডের উৎপাদন ও সেলস সম্পর্কে আমার অনেক ভালো ধারণা আছে।
এখন টেলিভিশনের রিপোর্টটি দেখে খুবই খারাপ লাগলো। কারণ কোম্পানিটি ভ্যাট ও ট্যাক্স ফাঁকি দিতেছে ভালো কথা কিন্তু সেটা আবার টেলিভিশনের মাধ্যমে মিথ্যা নাটক সাজিয়ে প্রচার করাটা নৈতিকতা বিরোধী।
তিনি বলেন বেঙ্গল বিস্কুট কোম্পানীর আসল বিষয়টি দেশের সরকারি প্রতিষ্ঠান যেমন- কাস্টমস ভ্যাট , ট্যাক্স, সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ কমিশন, দুদক এবং শেয়ারহোল্ডারগণের দৃষ্টিতে আনা দরকার।
এ কর্মকর্তা মনে করেন দেশের ভ্যাট ও ট্যাক্স বৃদ্ধি ও শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থে বিষয়টি কাস্টমস অথবা কাস্টমস গোয়েন্দাদের মাধ্যমে সঠিক তদন্ত করলে কোম্পানির আসল থলের বিড়াল বেরিয়ে আসবে।
সাবেক এই কর্মকর্তার তথ্য ও প্রতিবেদকের এক সপ্তাহ সরজমিনে গোপন তদন্তে উৎপাদন সংশ্লিষ্টদের মাধ্যমে জানা যায় বেঙ্গল বিস্কুট কোম্পানির দুটি মাঝারি ধরনের অটোমেটিক বিস্কুট লাইন।
দুটি অনেক বড় ধরনের অটোমেটিক বিস্কুট লাইন, একটি ক্যান্ডি লাইন এবং একটি বেকারী বিস্কুট তৈরির উৎপাদন লাইন রয়েছে।উক্ত উৎপাদন লাইনের মাধ্যমে কোম্পানী ১২ ঘণ্টা করে দুই শিপ্টে প্রতিদিন ২৪ ঘণ্টা উৎপাদন করে।
যেখানে প্রায় ৭০ মেট্রিক টন বিস্কুট ও ক্যান্ডি উৎপাদিত হয়, মাসে প্রায় এক হাজার আটশো মেট্রিক টন আর বছরে প্রথম দাঁড়ায় প্রায় একুশ হাজার ছয়শো মেট্রিক টন। প্রতিদিন ১২/১৩টি বড় কাভার্ড ভ্যান ও ট্রাকের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন জেলায় এসব মালামাল সরবরাহ কর হয়।
এক্ষেত্রে সরকারকে ট্যাক্স ও ভ্যাট ফাঁকি দেওয়ার জন্য ভূয়া মূসক চালান ব্যবহার করে যার প্রমাণ আমাদের প্রতিবেদকের হাতে রয়েছে। ফ্যাক্টরি ম্যানেজারের স্বাক্ষরিত ভুয়া চালানের মাধ্যমে বিস্কুট ও ক্যান্ডি বিভিন্ন বিক্রয় কেন্দ্রে প্রেরণ করা হয়।কাস্টমস কর্মকর্তাদের ফাঁকি দেওয়ার জন্য প্রতিদিন সন্ধ্যার পর থেকে সকাল ১০টা পর্যন্ত ট্রাকগুলো লোড করা হয়।
আরও পড়ুন…দুদকের এনফোর্সমেন্ট অভিযানে অনিয়ম ও প্রতারণার অনুসন্ধান
উক্ত কোম্পানি সারা বাংলাদেশে ২৬টি বিক্রয় কেন্দ্রের মাধ্যমে বিস্কুট ও ক্যান্ডি প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ২৯ থেকে ৩০ কোটি টাকার পণ্য উৎপাদন ও বিক্রয় করে থাকেন।
উক্ত পণ্য বিক্রয় করে কোম্পানি যে পরিমাণ ভ্যাট দিয়ে থাকেন তাতে মাসে প্রায় ১ কোটি পঞ্চাশ লাখ টাকার উপরে শুধু ভ্যাটই ফাঁকি দিয়ে থাকেন ও পার্টি পেমেন্টের উপর অ্যাডভান্স ট্যাক্স ও বৎসরে প্রচুর পরিমাণে ট্যাক্স ফাঁকি দিয়ে সরকার ও শেয়ারহোল্ডারদের ঠকাচ্ছেন।
বিষয়টি নিয়ে কাস্টমস অফিস বা কাস্টমস গোয়েন্দা সংস্থা ২৪ ঘন্টা নজরদারি করলে বেঙ্গল বিস্কুট-এর সঠিক তথ্য বেড়িয়ে আসবে। এই কোম্পানি যে সরকারকে ট্যাক্স ও ভ্যাট ফাঁকি দিচ্ছে তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ কাস্টমস কর্মকর্তাদেরকে ম্যানেজ করার জন্য কোম্পানিতে পাঁচ লাখ টাকার একটি বিলও পাস করা হয়েছে যার কপি প্রতিবেদকের হস্তগত।
উক্ত কোম্পানির যে সকল তথ্য পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে সে সকল উৎপাদন ও বিক্রির সঠিক তথ্য এবং ভুয়া মূসক চালানের ডকুমেন্টস আমাদের প্রতিবেদকের কাছে রয়েছে।
এছাড়াও কোম্পানি নন ভ্যাট পণ্য ময়দার উৎপাদন বেশি দেখানো হয়। ভাংগা-ছুড়া একটা ময়দার মিল আছে তাতে মাসে একদিনও উৎপাদন হয় না, শুধু কাস্টম কারখানা ভিজিট এ আসলে ওই সময় টুকু উৎপাদন করেন।
কোম্পানির ফ্যাক্টরিতে ২৪ ঘন্টায় লোক কাজ করে। প্রায় এক হাজার, বিক্রয় কেন্দ্রে প্রায় এক হাজার দুইশত ও প্রধান কার্যালয়ে পঞ্চাশ জন সর্বমোট প্রায় ২২৫০ জন কর্মী কাজ করেন।
অথচ অত্র কোম্পানি পাবলিক একাউন্টে লোকসংখ্যা দেখানো হয়েছে ৭৫০ জন। কোম্পানি এখন টিভি’র মাধ্যমে প্রচার করেছেন তারা শ্রমিকদের কমপক্ষে ৮ ঘণ্টায় বেতন দেন দশ হাজার টাকা।
এটাও মিথ্য তথ্য প্রচার করিয়েছেন। কোম্পানি বেশির ভাগ প্যাকিং ও প্রোডাকশন শ্রমিকদের ১২ ঘণ্টায় বেতন দেন ৮ থেকে দশ হাজার টাকা। এ ছাড়াও চাকুরির বয়স বছরের পর বছর পেরিয়ে গেলেও শ্রমিকদের স্থায়ী না করে শ্রমিকদের ঠকাচ্ছেন। কারখানায় এক হাজার লোকের মধ্যে প্রায় ৬০০ থেকে ৭০০ লোকের নিয়োগ পত্রই দেওয়া হয় না শ্রমিকদের স্থায়ী করা তো দূরের কথা ।
এছাড়াও সরকারের গেজেট রয়েছে, শ্রমিক ও কর্মকর্তাদের মোট বেতনের বেসিক থাকবে ৬০% কিন্তু বেঙ্গল বিস্কুট কোম্পানির সকল এমপ্লয়ীদের মোট বেতনের বেসিক ৩৫%। এখানেও কোম্পানিতে কর্মরতদের ঈদ বোনাস, প্রভিডেন্ট ফান্ড ও গ্র্যাচুইটিতে ঠকাচ্ছে।
অত্র কোম্পানি দুইটি একাউন্ট মেইনটেইন করে। যেমন- একটা পাবলিক একাউন্ট আর একটা ম্যানেজমেন্ট একাউন্ট। ম্যানেজমেন্ট একাউন্টে এ উৎপাদন, বিক্রয় ও লাভ লোকসানের সঠিক তথ্য রয়েছে।
এ বিষয়ে কোম্পানির সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা হলে প্রতিষ্ঠানটির ঊর্ধ্বতন কেউ কথা না বলে বরঞ্চ বিভিন্ন মাধ্যম থেকে প্রতিবেদককে হুমকি ধামকি দেয়া হচ্ছে এমনকি সংবাদ প্রকাশ হলে পত্রিকাটি বন্ধ করে দেয়ার হুমকিও দেয়া হয়।


মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়েছে.