জলবায়ু পরিবর্তনে বদলে যাচ্ছে শীত, নতুন বাস্তবতায় কৃষিতে বড় চ্যালেঞ্জ

আল-আদনান পারভেজ

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে ঋতুচক্রে দৃশ্যমান পরিবর্তন ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বিশেষ করে শীতকাল তার স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য হারিয়ে ফেলছে, যার প্রভাব সরাসরি পড়ছে কৃষি ও খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থায়।

Islami Bank

বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে শীত এখন আর আগের মতো দীর্ঘস্থায়ী বা তীব্র নয়; বরং তা হয়ে উঠছে সংক্ষিপ্ত, মৃদু এবং অনেক ক্ষেত্রে অনিশ্চিত।

এক সময় শীত মানেই ছিল ঘন কুয়াশা, কনকনে ঠান্ডা আর দীর্ঘস্থায়ী শৈত্যপ্রবাহ। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই চিত্র দ্রুত বদলেছে। আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, শীতকালে গড় তাপমাত্রা ধীরে ধীরে বাড়ছে এবং শীতের দিনসংখ্যা কমে আসছে। ফলে দীর্ঘস্থায়ী শৈত্যপ্রবাহের পরিবর্তে এখন দেখা যাচ্ছে স্বল্পস্থায়ী ও অনিয়মিত ঠান্ডা আবহাওয়া।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিবর্তনের মূল কারণ জলবায়ু পরিবর্তন। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যার প্রভাব সরাসরি পড়ছে ঋতুচক্রে। এর ফলে শীতকাল তার স্বাভাবিক রূপ হারিয়ে ফেলছে এবং এর প্রভাব কৃষি খাতে ক্রমেই গভীর হচ্ছে।

কৃষি, যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে প্রাকৃতিক ঋতুচক্রের ওপর নির্ভরশীল, এখন এক নতুন অনিশ্চয়তার মুখোমুখি। আগে যেখানে নির্দিষ্ট সময় অনুযায়ী বপন ও ফসল কাটার পরিকল্পনা করা যেত, এখন সেই ধারাবাহিকতা ভেঙে পড়ছে। বৃষ্টিপাত কখনও আগে, কখনও দেরিতে, আবার কখনও একেবারেই না হওয়ায় কৃষকদের বারবার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে হচ্ছে।

তাপমাত্রার অস্বাভাবিক ওঠানামাও ফসল উৎপাদনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। প্রতিটি ফসলের জন্য নির্দিষ্ট তাপমাত্রা প্রয়োজন হয়। কিন্তু তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় অনেক ফসলের ফুল ফোটা, পরাগায়ন ও দানা গঠনে সমস্যা দেখা দিচ্ছে। এতে ফলন কমে যাচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে খাদ্যের পুষ্টিগুণও হ্রাস পাচ্ছে।

পানির প্রাপ্যতাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোথাও দীর্ঘ খরায় মাটির আর্দ্রতা কমে যাচ্ছে, আবার কোথাও অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতে ফসল নষ্ট হচ্ছে এবং মাটির পুষ্টি উপাদান ধুয়ে যাচ্ছে।

আরও পড়ুন…আরও ৪ র‌্যাম্প যুক্ত হচ্ছে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে

one pherma

এই দুই ধরনের বিপরীত পরিস্থিতি কৃষি ব্যবস্থাপনাকে আরও জটিল করে তুলছে। অনেক কৃষককে সেচ ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যা সবার পক্ষে সহজলভ্য নয়।

এছাড়া মাটির গুণগত মানও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অতিবৃষ্টি ও তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে মাটির জৈব উপাদান কমে যাচ্ছে এবং ক্ষয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাওয়ায় উর্বর জমি ধীরে ধীরে অনাবাদী হয়ে পড়ছে, যা খাদ্য নিরাপত্তার জন্য দীর্ঘমেয়াদি হুমকি তৈরি করছে।

একই সঙ্গে প্রাকৃতিক দুর্যোগের মাত্রা ও ঘনত্বও বেড়েছে। ঝড়, বন্যা ও তাপপ্রবাহ এখন প্রায় নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা মুহূর্তের মধ্যে কৃষকের পুরো ফসল ধ্বংস করে দিতে পারে। এতে কৃষকের আর্থিক ঝুঁকি বাড়ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে তারা কৃষিতে বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন।

তবে এই চ্যালেঞ্জের মধ্যেও অভিযোজনের চেষ্টা চলছে। অনেক কৃষক এখন একক ফসলের পরিবর্তে বহুমুখী চাষে ঝুঁকছেন, যাতে ঝুঁকি কমানো যায়। তাপ, খরা বা লবণাক্ততা সহনশীল উন্নত বীজের ব্যবহার বাড়ছে। পাশাপাশি মোবাইলভিত্তিক আবহাওয়া তথ্য ও ডিজিটাল প্রযুক্তি কৃষকদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করছে।

সরকার ও বিভিন্ন সংস্থাও জলবায়ু সহনশীল কৃষি ব্যবস্থার দিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। প্রশিক্ষণ, আর্থিক সহায়তা এবং নীতিগত পরিবর্তনের মাধ্যমে কৃষকদের নতুন প্রযুক্তি ও পদ্ধতি গ্রহণে উৎসাহিত করা হচ্ছে।

সব মিলিয়ে, জলবায়ু পরিবর্তন শুধু পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি কৃষি ব্যবস্থাকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করছে। পরিবর্তিত শীতকাল এবং অনিশ্চিত আবহাওয়া ভবিষ্যতের কৃষিকে আরও চ্যালেঞ্জিং করে তুলছে। তবে সঠিক পরিকল্পনা ও অভিযোজন কৌশল গ্রহণ করা গেলে এই সংকটের মধ্যেও টেকসই কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।

ইবাংলা বাএ

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়েছে.

Contact Us