শিবচরে পদ্মায় ভাঙ্গনে বিলুপ্ত গ্রামের মানুষদের জীবন গড়ার সংগ্রাম
ইবাংলা.প্রেস | মোঃ আবুল খায়ের খান | ১৫ এপ্রিল ২০২৬
মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার পদ্মা নদীর বুকে জেগে ওঠা বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চলের মানুষের জীবন যেন প্রতিনিয়ত অনিশ্চয়তার সঙ্গে লড়াই। নদীভাঙন, দারিদ্র্য, যোগাযোগ সংকট এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ—সব মিলিয়ে তাদের দিন কাটে চরম দুর্ভোগের মধ্যে।
জেগে উঠা চরে নতুন করে শুরু করেছে বারি ঘর নির্মান। শিবচর উপজেলার অন্যতম বৃহত্তম ইউনিয়ন হচ্ছে চরজানাজাত, পদ্মাবতী হওয়ায় প্রতি বছর নদী গর্ভে বিলিন হয়ে গেছে বাড়ী ঘর সহ পুরোনো ঐতিহ্য।
আরও পড়ুন…শিবচরে উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে পহেলা বৈশাখ উদযাপন
পদ্মার ভাঙন এখানে একটি চক্রের মতো। একদিকে ভাঙে, অন্যদিকে গড়ে ওঠে নতুন চর। কিন্তু এই গড়ার পেছনে লুকিয়ে থাকে বহু পরিবারের সর্বস্ব হারানোর বেদনা।
ভিটেমাটি হারিয়ে অনেকেই বছরের পর বছর অপেক্ষা করেন নতুন করে বসতি গড়ার সুযোগের জন্য। কারও সেই অপেক্ষা এক দশক ছাড়িয়ে যায়। চর জেগে উঠলেই মানুষ ছুটে যায় নতুন আশায়, কিন্তু সেখানে শুরু হয় আরেক সংগ্রাম।
জীবিকার জন্য কৃষি ও মাছ ধরা প্রধান ভরসা হলেও তা পুরোপুরি প্রকৃতিনির্ভর। ফলে বন্যা, খরা বা নদীভাঙনের ধাক্কায় মুহূর্তেই আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যায়।
চরাঞ্চলের মানুষের অন্যতম বড় সমস্যা যোগাযোগব্যবস্থা। অধিকাংশ এলাকায় কোনো পাকা সড়ক নেই, নৌকাই ভরসা। বিশেষ করে বর্ষায় নদীর স্রোত বেড়ে গেলে যাতায়াত হয়ে ওঠে ঝুঁকিপূর্ণ।
এতে রোগী হাসপাতালে নেওয়া কিংবা শিক্ষার্থীদের স্কুলে যাওয়া—সবই বাধাগ্রস্ত হয়। প্রতিবছর বর্ষা এলেই নতুন করে আতঙ্ক তৈরি হয়। পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তলিয়ে যায় বসতি, ভেসে যায় ঘরবাড়ি। নিরাপদ আশ্রয়ের অভাবে অনেক পরিবার সাময়িকভাবে অন্যত্র আশ্রয় নেয়।
শিবচরের চরজানাজাত, কাঠালবাড়ি ও মাদবরের চর এলাকায় সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ মানুষ এখনো মৌলিক সুবিধাবঞ্চিত। রাস্তাঘাট নেই, বিদ্যুৎ নেই,চিকিৎসা সেবা কেন্দ্র নেই, স্কুল নেই বিশুদ্ধ পানির সংকট তীব্র।
কাঠালবাড়ি ইউনিয়নের এক বাসিন্দা রাজা মিয়া বলেন, “নৌকা ছাড়া চলার উপায় নেই। অসুস্থ হলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া কঠিন। অনেক সময় চিকিৎসার অভাবে ছোট রোগও বড় হয়ে যায়।”
আরেক বাসিন্দা আজিজ মিয়া বলেন, “আমাদের কষ্ট কেউ দেখে না। প্রতি বছর ভাঙনে ঘর হারাই, আবার নতুন করে শুরু করি। কিন্তু উন্নয়নের ছোঁয়া পাই না।”
চরজানাজাত ইউনিয়নের কালাম বেপারী (৫৭) জানান, একাধিকবার নদীভাঙনে তার বসতভিটা বিলীন হয়েছে। বর্তমানে তিনি অন্যের জমিতে চাষাবাদ ও মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করছেন। তার ভাষায়, “আমরা যেন আলাদা এক জগতে বাস করি, যেখানে মৌলিক সুবিধাগুলো এখনো স্বপ্ন।”
চরাঞ্চলের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার অবস্থাও উদ্বেগজনক। যোগাযোগ সমস্যার কারণে শিক্ষার্থীরা নিয়মিত স্কুলে যেতে পারে না। অনেক শিশু অল্প বয়সেই জীবিকার সন্ধানে নেমে পড়ে।
অন্যদিকে, স্বাস্থ্যকেন্দ্র না থাকায় চিকিৎসাসেবা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। কলেজছাত্রী মিম আক্তার বলেন, “চর থেকে উপজেলা সদরে গিয়ে পড়াশোনা করা খুব কঠিন। নিয়মিত যাতায়াত করা সম্ভব হয় না। এখানে শিক্ষা ও চিকিৎসার সুযোগ বাড়ানো জরুরি।”
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা বলছেন, চরাঞ্চলের মানুষের জন্য টেকসই বাঁধ নির্মাণ, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন এবং বিদ্যুৎ ও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা জরুরি।
সচেতন মহলের মতে, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া এই অঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়ন সম্ভব নয়। অবকাঠামো উন্নয়ন, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাসেবা সম্প্রসারণ এবং বিকল্প কর্মসংস্থান তৈরি না হলে চরাঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়বে।
দির্ঘ ভাঙ্গনে মাদারীপুর জেলার মানচিত্র ও নকসায় পরিবর্তন হয়েছে অনেক, একাধিক বার ভাঙ্গনের ফলে অনেক পরিবার বালাসুর, সদরপুর সহ বিভিন্ন জেলায় স্হায়ী বসবাস শুরু করেছেে, পদ্মাসেতু নির্মানের পরে নদীর পানি গতিপথ পরিবর্তন সহ অগনিত চরে হাজার হাজার একর ফসলী জমি জেগে উঠেছে, পত্রিক ভিটা মাটি রক্ষা করতে নতুন স্বপ্ন নিয়ে জেগে চরে ঘর বাড়ী নির্মান করছে,নানা সমস্যা ও পুনরায় ভাঙ্গন আতঙ্ক নিয়ে হিরাখার বাজার নামক এলাকায় ৯ শত পরিবার বসবাস শুরু করছে, ভাঙ্গন আতঙ্কে কেহ পাকা ভবন, গাছপালা ও দির্ঘ স্হায়ী হবার স্বপ্ন দেখছেনা। পদ্মার বুকে গড়ে ওঠা এসব চর যেন দেশের এক ভিন্ন বাস্তবতা—যেখানে প্রতিদিনই বেঁচে থাকা মানে নতুন করে লড়াই শুরু করা।


মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়েছে.