বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের একক সর্ববৃহৎ বাজার যুক্তরাষ্ট্র। উচ্চ শুল্ক আরোপ ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপের কারণে দেশটিতে তৈরি পোশাকের অভ্যন্তরীণ চাহিদায় বড় ধরনের সংকোচন দেখা দিয়েছে।
চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে (জুলাই-মার্চ) বাংলাদেশ ও এর প্রতিযোগী দেশগুলোর রপ্তানি কমেছে। এর মধ্যে চীন ও ভারতের রপ্তানিতে বড় ধরনের পতন ঘটেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য বিভাগের বস্ত্র ও পোশাক দপ্তরের (ওটেক্সা) তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে ২০.৩৮ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ে রপ্তানি ছিল ২২.২৪ বিলিয়ন ডলার।
সে হিসাবে রপ্তানি কমেছে ৮.৩৮ শতাংশ। তবে এই হার যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক পোশাক আমদানি কমার হারের চেয়ে কম।
একই সময়ে দেশটির মোট পোশাক আমদানি কমেছে প্রায় ১১ শতাংশ।
একক মাস হিসেবে মার্চে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রপ্তানি কমেছে ৮.০৮ শতাংশ। একই সময়ে চীনের রপ্তানি কমেছে ৩৭.২৪ শতাংশ এবং ভারতের কমেছে ৩২.৬৪ শতাংশ।
চলতি অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে চীনের তৈরি পোশাক রপ্তানি বড় সংকটে পড়েছে। দেশটির রপ্তানি কমেছে ৫২.৯১ শতাংশ। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশ এখন দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানিকারক, আর চীন নেমে গেছে তৃতীয় অবস্থানে। আলোচ্য সময়ে চীন রপ্তানি করেছে ১৬.৯৮ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক, যেখানে আগের অর্থবছরের একই সময়ে রপ্তানি ছিল ৩৬.০৬ বিলিয়ন ডলার।
একই সময়ে ভারত যুক্তরাষ্ট্রে ১১ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ১৫.০৭ বিলিয়ন ডলার। দেশটির রপ্তানি কমেছে প্রায় ২৭ শতাংশ। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ভারতের অবস্থান এক ধাপ পিছিয়ে পঞ্চমে নেমে গেছে। ভারতের জায়গা দখল করেছে ইন্দোনেশিয়া।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি পোশাক আমদানি কমার পেছনে মানুষের আয় কমে যাওয়ার চেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে উচ্চ শুল্ক, মূল্যস্ফীতি, ভোক্তা ব্যয় সংকোচন এবং আমদানিকারকদের সতর্ক ক্রয়নীতি।
ওটেক্সার তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি পোশাক আমদানি কমেছে ১১.৬৩ শতাংশ। এ সময়ে দেশটি ১৭৭.২৬ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক আমদানি করেছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ২০০.৫৮ বিলিয়ন ডলার।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বাংলানিউজকে বলেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, তেলের দাম বৃদ্ধি ও যুক্তরাষ্ট্রের ট্যারিফ নীতির কারণে দেশটির বাজার অস্থির অবস্থায় রয়েছে। ফলে মার্কিন ভোক্তারা প্রয়োজনীয় পণ্যের বাইরে কেনাকাটা কমিয়ে দিয়েছেন। একই সঙ্গে আমদানিকারকেরা ইনভেন্টরি বা মজুত ব্যবস্থাপনা কঠোর করায় সামগ্রিক আমদানিও কমেছে। তবে এ পরিস্থিতিতেও বাংলাদেশের রপ্তানি তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে।
তিনি বলেন, চীনের ওপর ট্যারিফ ও অন্যান্য চাপ বাড়ায় আন্তর্জাতিক ক্রেতারা ‘চায়না প্লাস ওয়ান’ কৌশলে বিকল্প উৎস খুঁজছে। এর সবচেয়ে বেশি সুবিধা পেয়েছে ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়া। কাঁচামাল, বিদেশি বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতায় এগিয়ে থাকায় ভিয়েতনামে বেশি অর্ডার যাচ্ছে। অন্যদিকে কম উৎপাদন ব্যয়ের কারণে কিছু অর্ডার কম্বোডিয়ায় স্থানান্তর হচ্ছে। বাংলাদেশের উৎপাদন সক্ষমতা ও পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানো গেলে ভবিষ্যতে রপ্তানি আরও বাড়ার সুযোগ রয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে নতুন করে উচ্চ ট্যারিফ আরোপ, বিশেষ করে চীনা পণ্যের ওপর ১৪৫ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক বৃদ্ধির কারণে মার্কিন আমদানিকারকেরা নতুন কার্যাদেশ কমিয়েছে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতির কারণে পোশাকের দাম বেড়ে যাওয়ায় ভোক্তারাও প্রয়োজন ছাড়া নতুন পোশাক কেনা কমিয়ে দিয়েছেন।
এ ছাড়া ২০২৪ সালের শেষ ও ২০২৫ সালের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের বড় খুচরা বিক্রেতারা আগাম বিপুল পরিমাণ পণ্য আমদানি করে গুদামে মজুত করেছিল। পরে চাহিদা কমে যাওয়ায় তারা নতুন অর্ডার কমিয়ে দেয়।
বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার পরিবর্তনের কারণেও বাজারে পুনর্বিন্যাস ঘটছে। যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে চীনের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম, ভারত ও মেক্সিকোর মতো দেশ থেকে সোর্সিং বাড়াচ্ছে। ফলে কিছু দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও বাংলাদেশ তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থানে রয়েছে।
জোসেফ/


মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়েছে.