নীরব নির্যাতনের শিকার মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভরা

ইবাংলা.প্রেস | রিয়াজুল ইসলাম | ৩ জুলাই ২০২৫, ঢাকা

১৬ ঘণ্টা কাজ, না খেয়ে দিন শেষ—মুখে হাসি, ভেতরে কান্না: নীরব নির্যাতনের শিকার মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভরা

Islami Bank

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে ওষুধ কোম্পানিগুলোর অগ্রগতির পেছনে যে মানুষগুলোর ঘাম, শ্রম আর ত্যাগ জড়িয়ে রয়েছে, তাদের একজন হচ্ছেন মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভ, সংক্ষেপে যাদের সবাই ‘এমআর’ নামেই চেনে।

তারা ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধি হিসেবে চিকিৎসকদের কাছে নতুন ওষুধের তথ্য পৌঁছে দেন, বাজার ধরে রাখেন এবং কোম্পানির বিক্রয় লক্ষ্যমাত্রা পূরণে নিরলস কাজ করেন।

আরও পড়ুন…দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন মহামারির পর্যায়ে : উপদেষ্টা শারমীন এস মুরশিদ

কিন্তু এই চাকরির উজ্জ্বল বাইরের রঙের আড়ালে লুকিয়ে আছে ভয়াবহ এক বাস্তবতা—চরম মানসিক চাপ, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, অপমান, অনিশ্চয়তা এবং অমানবিক শর্তে টিকে থাকার লড়াই।

একটি দিনের চিত্র: সকাল ৮:৩০মিনিট থেকে রাত ১২টা, রাজধানীর একটি নামকরা ওষুধ কোম্পানিতে কর্মরত রিপ্রেজেন্টেটিভ মাহমুদুল হাসান বলেন,

“সকাল ৮:৩০ মিনিটে অফিসে রিপোর্ট দিয়ে বের হই, কখনো কখনো চিকিৎসকের সিরিয়াল পেতে ক্লিনিকে রাত ৯টা-১১টা পর্যন্ত ডাক্তারের জন্য অপেক্ষা করি। তার পরে আবার ফার্মেসি গুলোতে অর্ডার ও কালেকশন করার জন্য সেই সময় পর্যন্ত একটানা ঘুরতে হয়, মাঝে অনেক সময় খেতেও পারি না। বাসায় ফিরি প্রায় মধ্যরাতে তখন আবার শুরু করেন মিটিং।”

এইচআর বিভাগের চাপ, ঊর্ধ্বতনের নিয়মিত হুমকি এবং বিক্রয় লক্ষ্যমাত্রা পূরণের ভয়—সব মিলিয়ে একজন এমআর যেন প্রতিনিয়ত এক মানসিক যুদ্ধে লিপ্ত। অনেকেই বলেন, “চিকিৎসকের সামনে সবসময় হাসতে হয়, ভদ্রভাবে কথা বলতে হয়—এমন যদি পেছনে বস গালি দেয় বা বেতন কেটে নেয়।”

বেতন অনিশ্চিত:

অনেক ওষুধ কোম্পানিতে মাস শেষে টার্গেট পূরণ না হলে বোনাস তো দূরের কথা, মূল বেতনেরও কাটছাঁট হয়। অধিকাংশ এমআরদের কোনো স্বাস্থ্যবীমা নেই, নেই সঠিক ছুটির ব্যবস্থা। অসুস্থ হলেও টার্গেট মেটানো বাধ্যতামূলক। এমনকি সন্তান জন্মের সময় পর্যন্তও ছুটি পান না অনেকে।

one pherma

নীরব সহিংসতা ও অসম্মান:
একাধিক এমআর অভিযোগ করেন, অনেক চিকিৎসক তাদের সাথে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন, অপমান করেন কিংবা একাধিক ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধি থাকা অবস্থায় সময় দিতে অস্বীকার করেন।

“আমরা অনুরোধ করি, মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকি। অথচ একটু সম্মান পাই না,” —বলেছেন চট্টগ্রামের এক সিনিয়র এমআর।
আরো কিছু কথা ভুক্ত ভোগীরা জানান শুক্রবার্ শনিবার হেড অফিসের সকালে ছুটি কাটান কিন্তু কোনো এমআর শুক্রবার পর্যন্ত ছুটি পান না।

এই পেশার ভবিষ্যৎ কোথায়?
এই পেশার প্রতি তরুণদের আগ্রহ থাকলেও দীর্ঘদিন টিকে থাকা কষ্টসাধ্য। বেশিরভাগ মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভই তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে পেশা বদলে ফেলেন। কারণ হিসেবে তারা বলেন— “স্বাস্থ্যহীন জীবন, পরিবারে সময় না দেওয়া, আর্থিক অনিশ্চয়তা এবং অপমান—সব মিলে জীবন একসময় অসহনীয় হয়ে ওঠে।”

সমাধান কী হতে পারে?
বিশ্লেষকদের মতে, এমআর পেশাটি বাংলাদেশে এখনও ‘অস্বীকৃত ফ্রন্টলাইন ওয়ার্কার’ হিসেবেই থেকে গেছে। সরকার এবং ওষুধ কোম্পানিগুলোর উচিত এই পেশাজীবীদের জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালা তৈরি করা, যেমন:

*** সুনির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা

*** বেতন ও ভাতা নির্ধারণে স্বচ্ছতা

*** স্বাস্থ্যবীমা ও নিরাপত্তা

*** প্রশিক্ষণ ও সম্মানজনক আচরণের নিশ্চয়তা

মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভদের এই ‘নীরব যুদ্ধ’ বন্ধ করতে হলে এখনই সময় সম্মান ও সহানুভূতির জায়গা থেকে ভাবার। না হলে দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্প—ফার্মাসিউটিক্যালস—এর ভিতরটাই একদিন দুর্বল হয়ে পড়বে

ইবাংলা বাএ

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়েছে.

Contact Us