রাজধানী ঢাকার উত্তরা এলাকার রিকশাচালক মিজানুর রহমান। এক সময় ভেবেছিলেন নিজের রিকশা থাকলে আর ভাড়া জমা দিতে হবে না, সংসারে আসবে স্বাচ্ছন্দ্য।
সেই আশায় তিনি ১ লাখ ২০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে রিকশা কেনেন। প্রথম কয়েক মাস নিয়মিত কিস্তি চালিয়ে যেতে পারলেও হঠাৎ ব্যাটারি নষ্ট হয়ে বিপদে পড়েন তিনি।
নতুন ব্যাটারি কিনতে দরকার হয় ২৮ হাজার টাকা। হাতে টাকা না থাকায় বাধ্য হয়ে আরও ৩০ হাজার টাকা ঋণ করেন। এখন একসঙ্গে দুই জায়গায় কিস্তি দিতে গিয়ে তিনি চরম দুরবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। সংসারের খরচ, বাড়িভাড়া আর কিস্তির চাপ মিলিয়ে নিঃশ্বাস নেওয়াই যেন কষ্টসাধ্য হয়ে উঠেছে।
মিজানের মতো একই অভিজ্ঞতা জানালেন রিকশাচালক মিলাত ও শাহাজান। তাঁদের কথায়- আমাদের আয়ের অর্ধেকেরও বেশি চলে যায় কিস্তি দিতে। এত কিছুর পর সংসার চালানো তো দূরের কথা, প্রতিদিনই নতুন দুশ্চিন্তা তৈরি হয়।
শাহাজান আরও যোগ করেন, এলাকার প্রায় ৮০ ভাগ রিকশা কিস্তিতে কেনা। ফলে আমাদের অধিকাংশই ঋণের জালে আটকে আছি। কিস্তি আর সংসারের খরচ মেলাতে না পেরে অনেক সময় ভাত না খেয়ে ঘুমাতে হয়।
শ্রমজীবী মানুষের এই বাস্তব চিত্রই তুলে ধরে কিস্তি নির্ভর ব্যবসার ভয়াবহ দিক। মানবাধিকারকর্মীদের মতে, সহজ শর্তে ঋণের সুবিধা না থাকায় পরিশ্রমী রিকশাচালকরা বেসরকারি মহাজন ও এনজিওদের কাছ থেকে উচ্চ সুদে ঋণ নিতে বাধ্য হন। প্রথমে স্বনির্ভরতার স্বপ্ন দেখলেও পরে তারা ঋণের দায়ে জড়িয়ে পড়েন এক অদৃশ্য শিকলে। আয়ের সামান্য তারতম্য বা হঠাৎ অসুস্থতা হলে এই শিকল আরও শক্ত হয়ে যায়।
স্থানীয় সচেতনদের মতে, শহরের নিম্ন আয়ের এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে আর্থিক সুরক্ষা দিতে হলে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ জরুরি। রিকশাচালক ও অনুরূপ শ্রমজীবী মানুষের জন্য ক্ষুদ্র ঋণ প্রকল্প, স্বল্পসুদের তহবিল এবং জরুরি সহায়তা তহবিল চালু করা প্রয়োজন। পাশাপাশি কিস্তি ব্যবসার নামে যারা শোষণ চালাচ্ছে তাদের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে আনাও অপরিহার্য।
রিকশাচালকরা আমাদের নগরজীবনের অগ্রগতির অন্যতম চালিকাশক্তি। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষকে গন্তব্যে পৌঁছে দিয়ে তারা যে ভূমিকা রাখছেন তা অনস্বীকার্য। অথচ জীবনের ঘামঝরা পরিশ্রমের ফল তাদের কাছে ফিরে আসছে না বরং ঋণের চাপ তাদের পরিবারকে অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
মিজান, মিলাত কিংবা শাহাজানের মতো অসংখ্য রিকশাচালক আজ কিস্তির ফাঁদে দিশেহারা। তাদের চোখের জল আর প্রতিদিনের হাহাকার আমাদের জন্য একটি স্পষ্ট বার্তা- স্বল্প আয়ের পরিশ্রমী মানুষদের প্রতি অবিচার বন্ধ করতে হবে এখনই। নয়তো এই বোঝা একদিন আমাদের পুরো সমাজের জন্যই অস্থিরতা বয়ে আনবে।


মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়েছে.