আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণার পর ভারত মাত্র একটি সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে—রায়টি তাদের নজরে আছে এবং ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী বাংলাদেশের মানুষের স্বার্থে ভারত অঙ্গীকারাবদ্ধ থাকবে। তবে দিল্লির ভেতরে শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিবিসির আলাপচারিতায় স্পষ্ট হয়েছে, এ রায়ের পরও শেখ হাসিনা সম্পর্কে ভারতের অবস্থান বদলাচ্ছে না এবং তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর প্রশ্নও উঠছে না।
৫ আগস্ট দেশত্যাগের পর থেকেই শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয়ে আছেন। ভারত বারবার জানিয়েছে—এটি কেবলই “সাময়িক মানবিক আশ্রয়”, এর চেয়ে বেশি কিছু নয়। রায় ঘোষণার পরও সেই অবস্থান অপরিবর্তিত থাকছে।
প্রত্যর্পণ চুক্তি ও ভারতের নীরবতা
বাংলাদেশ গত বছরের ডিসেম্বরেই ভারতকে ‘নোট ভার্বাল’ পাঠিয়ে শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর অনুরোধ জানায়। ভারত দুই দিনের মাথায় প্রাপ্তি স্বীকার করলেও এরপর আর কোনো অবস্থান জানায়নি। প্রায় এক বছর পেরিয়ে গেলেও ভারত বিষয়টি নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে নীরব রয়েছে।
ভারতের পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় জানিয়েছেন—প্রত্যর্পণ চুক্তির অসংখ্য ফাঁকফোকর ব্যবহার করে চাইলে তারা অনুরোধ খারিজ করতে বা বছরের পর বছর ঝুলিয়ে রাখতে পারে।
তখন শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে চার্জও গঠন হয়নি; আজ তিনি একজন দণ্ডিত আসামি। ফলে ভারতের ওপর এখন ব্যাখ্যা দেওয়ার চাপ বাড়ছে—একজন দণ্ডিত ও পলাতক অপরাধীকে কেন তারা আশ্রয় দিয়ে রেখেছে।
আরও পড়ুন…গুলি করে হত্যা পল্লবী থানা যুবদলের সদস্য সচিব কিবরিয়াকে
তবু দিল্লির মৌলিক অবস্থান একই: শেখ হাসিনাকে ভারতের মাটি থেকে ফেরত পাঠানো হবে না।
কেন খারিজ করা যেতে পারে বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধ
২০১৩ সালের প্রত্যর্পণ চুক্তিতে রয়েছে—অভিযোগ যদি ‘রাজনৈতিক চরিত্রের’ হয়, তাহলে অনুরোধ খারিজ করা যাবে। যদিও হত্যা, গণহত্যা, সন্ত্রাসবাদসহ কিছু অপরাধকে কখনই রাজনৈতিক বলা যাবে না।
কারণ শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে হত্যা, গণহত্যা, নির্যাতন—এসব অভিযোগ রয়েছে, তাই রাজনৈতিক অজুহাত দেওয়া কঠিন।
কিন্তু ভারত যে ধারা ব্যবহার করতে পারে তা হলো—
১. ‘সুষ্ঠু বিচার হয়নি’ ধারাটি
যদি অনুরোধ-প্রাপক দেশের মনে হয় অভিযোগগুলো “ন্যায়বিচারের স্বার্থে, সরল বিশ্বাসে আনা হয়নি”—তাহলে তারা অনুরোধ নাকচ করতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারত চাইলে সহজেই বলতে পারে বাংলাদেশের বিচার প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে হয়নি—এ কারণেই তারা শেখ হাসিনাকে ফেরত দিতে পারছে না।
২. সামরিক অপরাধের অভিযোগ
যদি অভিযোগগুলো ‘মিলিটারি অফেন্স’ হিসেবে দেখা হয়, তাহলেও প্রত্যর্পণ চুক্তির বাইরে পড়বে।
৩. নিজ দেশে মামলা থাকলে
যদি অনুরোধ-প্রাপক দেশে সেই ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা থাকে, তখন ফেরত না দেওয়ার সুযোগ থাকে।
যদিও শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে ভারত এ যুক্তি ব্যবহার করতে পারবে না, কারণ তার বিরুদ্ধে ভারতে কোনো মামলা নেই।
ভারতের অবস্থানে পরিবর্তনের কোনো ইঙ্গিত নেই
দিল্লির ভেতরের সূত্রগুলো বলছে—
শেখ হাসিনাকে আশ্রয় নিয়ে ভারত এখন ব্যাখ্যা দিতে বাধ্য হতে পারে
তবে আশ্রয় প্রত্যাহার বা তাকে বাংলাদেশে হস্তান্তর—দুটোই অত্যন্ত অসম্ভব
ভারতের মূল অবস্থান—তিনি মানবিক কারণে সাময়িক আশ্রয়ে আছেন—অপরিবর্তিত
অর্থাৎ, চাপ বাড়তে পারে, বিবৃতি আসতে পারে—কিন্তু শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর ঘটনা ঘটবে বলে কোনো ইঙ্গিত নেই।


মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়েছে.