ইরান যুদ্ধের দুই সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৪০০ কোটি ডলারের সামরিক ক্ষতি
ইবাংলা.প্রেস | নিজস্ব প্রতিবেদক | ১৫ মার্চ ২০২৬
দু’সপ্তাহের যুদ্ধে প্রায় ৪০০ কোটি ডলারের অস্ত্রপাতি ধ্বংস হয়েছে আমেরিকার। এছাড়া অপারেশনাল খরচ হয়েছে আনুমানিক ২৮০০ কোটি ডলার। সামরিক বিশ্লেষকদের বরাত দিয়ে এই হিসাব প্রকাশ করেছে তুরস্কের সংবাদসংস্থা আনাদোলু।
মার্কিন হাউস কমিটির একজন ডেমোক্রেট সদস্য কংগ্রেসনাল বাজেট অফিসকে (সিবিও) চিঠি দিয়ে যুদ্ধের প্রকৃত খরচ প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন । এ ব্যাপারে প্রতিরক্ষা অধিদপ্তর পেন্টাগন থেকে কোনো তথ্য পাবলিকলি জানানো হয়নি।
আনাদোলুর হিসাব অনুযায়ী, ইরানের হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ক্ষতি হয়েছে THAAD ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার। স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যাচ্ছে, আরব আমিরাত, জর্ডান ও সৌদি আরবের অন্তত চারটি AN/TPY-2 রাডার ধ্বংস হয়ে গেছে। এতে ক্ষতি হয়েছে অন্তত ২ বিলিয়ন ডলার।
কাতারের আল-উদেইদ বিমান ঘাঁটিতে AN/FPS-132 প্রাথমিক সতর্কতা রাডার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রাডারের মূল্য প্রায় ১.১ বিলিয়ন ডলার।১১টি MQ-9 রিপার ড্রোন ধ্বংস হয়েছে, যার মোট ক্ষতি প্রায় ৩৩০ মিলিয়ন ডলার।
কুয়েতের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে সংঘর্ষে তিনটি F-15E স্ট্রাইক ইগল ফাইটার জেট ধ্বংস হয়েছে। প্রতিস্থাপনের খরচ প্রায় ২৮২ মিলিয়ন ডলার।একটি KC-135 স্ট্রাটো ট্যাঙ্কার পশ্চিম ইরাকে ধ্বংস হয়েছে, যার মূল্য ৮০ মিলিয়ন ডলার।
ইরান মার্কিন পঞ্চম নৌবাহিনী ঘাঁটি, বাহরাইনে দুটি স্যাটেলাইট যোগাযোগ টার্মিনাল ও বড় কয়েকটি ভবন ধ্বংস করেছে। কুয়েতে ক্যাম্প আরিফজানে তিনটি রাডোম ধ্বংস হয়েছে, যার ক্ষতি প্রায় ৩০ মিলিয়ন ডলার।সবমিলিয়ে এখন পর্যন্ত ৩৮৪ কোট ডলারের সামরিক সরঞ্জাম ক্ষতি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের। অস্ত্রপাতির ক্ষতির বাইরে যুদ্ধ পরিচালনায় প্রতিদিন কত ব্যয় কত হচ্ছে তা নিয়ে বিভিন্ন অনুমান আছে।
আরও পড়ুন…আজ মির্জা আব্বাসকে সিঙ্গাপুর নেওয়া হচ্ছে
নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, যুদ্ধের প্রথম সপ্তাহে প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে। কংগ্রেসের কিছু সূত্র বলেছে, প্রতিদিন যুদ্ধের খরচ প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার। আবার কিছু রাজনৈতিক সূত্র মনে করছে খরচ প্রতিদিন প্রায় ২ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই যুদ্ধ এত ব্যয়বহুল হওয়ার কিছু কারণ আছে। ইরানের সস্তা মিসাইল ধ্বংস করতে যুক্তরাষ্ট্র যে ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করছে, সেগুলোর প্রতিটির দাম ৪০-৫০ লাখ ডলার। এক রাতে বহু মিসাইল ছোড়া হলে খরচ দ্রুত বেড়ে যায়।
দ্বিতীয়ত, ইরানে বোমা মারার জন্য যেসব আধুনিক যুদ্ধবিমান ব্যবহার করা হচ্ছে, বিশেষ করে F-35, F-18, B-2 বা B-1 বোমারু বিমান, সেগুলো আকশে উড়লে ঘণ্টাপ্রতি ব্যয় হয় ২০-৫০ হাজার ডলার। বিমানবাহী রণতরী চালাতে প্রতিদিন ব্যয় হয় ৬০-৮০ লাখ ডলার।
ওয়াশিংটন-ভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (CSIS) এর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুদ্ধের প্রথম ১০০ ঘন্টায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন ধরনের ২০০০ এর বেশি যুদ্ধাস্ত্র ব্যয় করেছে এবং অনুমান করা হয়েছে যে সমপরিমাণ ভিত্তিতে যুদ্ধাস্ত্রের মজুদ পূরণ করতে ৩.১ বিলিয়ন ডলার খরচ হবে, যার সাথে প্রতিদিন ব্যয় ৭৫৮ মিলিয়ন ডলার বৃদ্ধি পাবে।
সবমিলিয়ে প্রথম ১০০ ঘণ্টায় প্রায় ৪-৬ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হয়েছে।তৃতীয়ত, মধ্যপ্রাচ্যে বিশাল সামরিক মোতায়েন। যুক্তরাষ্ট্র শুধু স্থায়ী ঘাঁটিই ব্যবহার করছে না, এলাকার বাইরে থেকেও অনেক সামরিক সরঞ্জাম এনে মোতায়েন করেছে।
সামরিক ফ্লাইট-ট্র্যাকিং তথ্য অনুসারে, ফেব্রুয়ারির শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে ১২০ টিরও বেশি বিমান মোতায়েন করেছে, যা ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের পর সবচেয়ে বেশি। একজন সাবেক ব্রিটিশ সামরিক কর্মকর্তা আলজাজিরাকে বলেছেন— এই অতিরিক্ত সামরিক উপস্থিতিই খরচ অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে।যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এই টাকা কোনো ব্যাপার না। ট্রাম্প প্রশাসন তাদের এক ট্রিলিয়ন ডিফেন্স বাজেটে অতিরিক্ত ৫০ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দের দাবি করেছে।
তবে তাদের চিন্তা হচ্ছে দুটো। টাকা থাকলেও এসব অস্ত্রপাতি দ্রুত মেরামত বা পুনরায় উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না। তাই অন্য উপায় চিন্তা করতে হচ্ছে। ইউক্রেন থেকে কমদামি ইন্টারসেটর বা ইউরোপের অস্ত্র অর্ডার বন্ধ রেখে উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। আরেকটা চিন্তা হচ্ছে যুদ্ধের ব্যয় নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে অসন্তোষ তৈরি হচ্ছে। ট্রাম্প নির্বাচনের আগে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন লিভিং কস্ট কমাবেন, এখন সেটা উল্টো বেড়ে যাচ্ছে।


মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়েছে.