ইসরায়েলি হামলায় একসঙ্গে নিহত ইরানের নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান ও উপ-প্রধান
ইবাংলা.প্রেস | নিজস্ব প্রতিবেদক | ১৮ মার্চ ২০২৬
দীর্ঘ যুদ্ধের দিকে ধাবিত হচ্ছে ইরানের সঙ্গে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে হামলা ও পাল্টা হামলার তীব্রতা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানের মুখে নিজেদের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হারানোর পর থেকে এখন পর্যন্ত ইসরায়েলের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি ও স্থাপনাগুলোতে একের পর এক হামলা চালিয়ে যাচ্ছে দেশটি। ইরানের আগ্রাসী প্রতিরোধ যুদ্ধের সামনে যখন অনেকটাই নাস্তানাবুদ শত্রুপক্ষ, ঠিক তখনই বড় আরেকটি ধাক্কা এসে লেগেছে তাদের গায়ে।
যুদ্ধের ২০ দিনের মাথায় এসে এবার নিজেদের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান আলী লারিজানি ও উপ-প্রধান আলীরেজা বায়েতকে হারিয়েছে ইরান। মঙ্গলবার (১৭ মার্চ) রাতে ইসরায়েলের হামলায় দুজন একসঙ্গেই প্রাণ হারিয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছে খোদ ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ। খবর তাসনিম নিউজের।
এর আগে, ইসরায়েল সর্বপ্রথম দাবি করেছিল, তারা একটি লক্ষ্যভেদী হামলার মাধ্যমে আলী লারিজানিকে হত্যা করেছে। পরে ইরানের নিরাপত্তা পরিষদের বিবৃতির মাধ্যমে জানা যায়, মঙ্গলবার রাতে ইসরায়েলি হামলায় আলী লারিজানি, তার ছেলে এবং একজন সহকারী নিহত হয়েছেন। আরও কিছু সময় পর জানা যায়, আলী লারিজানির সঙ্গে নিহত ওই সহকারী হলেন নিরাপত্তা পরিষদের উপ-প্রধান আলীরেজা বায়েত।
আলী লারিজানির মৃত্যুতে শোক জানিয়ে ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ বিবৃতিতে বলে, ‘ইরান ও ইসলামি বিপ্লবের উন্নতির জন্য আজীবন সংগ্রামের পর তিনি অবশেষে তার দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন পূরণ করেছেন, সত্যের ডাকে সাড়া দিয়েছেন এবং অত্যন্ত গৌরবের সাথে দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় শাহাদাতের বরকতময় মর্যাদা লাভ করেছেন।
আরও পড়ুন…ট্রাম্পের শীর্ষ উপদেষ্টার পদত্যাগ ইরান যুদ্ধ নিয়ে মতবিরোধে
এদিকে আলী লারিজানির নিহত হওয়ার ঘটনায় প্রচণ্ড ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছে ইরান। কঠোর প্রতিশোধের হুমকি দিয়ে তেহরান বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে এবার ‘চূড়ান্ত জবাব’ দেওয়া হবে। একইসঙ্গে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) জানিয়েছে, ইতোমধ্যেই পাল্টা হামলা শুরু করেছে তারা।
আলী লারিজানি ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের (এসএনএসসি) প্রভাবশালী সচিব। ২০২৫ সালের অগাস্টে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান তাকে এসএনএসসি’র সচিব এবং পরিষদে ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দেন।
ইরানি গণমাধ্যমগুলোতে তাকে প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতার উপদেষ্টা হিসেবেও পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তিনি ২০০৮ সালের মে থেকে ২০২০ সালের মে পর্যন্ত ১২ বছর ইরানের সংসদের স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।যদিও তিনি ২০০৮ সাল থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত সংসদে প্রিন্সিপলিস্ট গোষ্ঠীর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাকে একজন মধ্যপন্থি রক্ষণশীল হিসেবে দেখা গেছে।
স্পিকার হওয়ার আগে লারিজানি ২০০৫ সাল থেকে ২০০৭ সালের মধ্যে ইরানের প্রধান পারমাণবিক নেগোশিয়েটর বা আলোচক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তার ভাই, সাদেঘ লারিজানিও ইসলামি প্রজাতন্ত্রের আরেকজন প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। তিনি এক্সপেডিয়েন্সি কাউন্সিলের সভাপতিত্ব করেন, যেটি একটি শীর্ষ সালিশি সংস্থা এবং সংসদ ও সাংবিধানিক তত্ত্বাবধায়ক সংস্থা গার্ডিয়ান কাউন্সিলের মধ্যে চূড়ান্ত সালিশকারী হিসেবে কাজ করে।
অন্যদিকে ইরানের বার্তাসংস্থা তাসনিম নিউজ আলীরেজা বায়েতকে একজন ‘দক্ষ কিন্তু প্রচারবিমুখ ব্যবস্থাপক’ হিসেবে অভিহিত করেছে। তাসনিমের তথ্য অনুযায়ী, নিরাপত্তা পরিষদে যোগ দেওয়ার আগে বায়েত ইরানের হজ ও তীর্থযাত্রা সংস্থার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি এর আগে দেশের বিভিন্ন নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন।
উল্লেখ্য, ইরানের পরমাণু প্রকল্প নিয়ে গত ৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২১ দিন ধরে সংলাপ চলে তেহরান এবং ওয়াশিংটনের মধ্যে। ২৭ ফেব্রুয়ারি কোনো প্রকার সমঝোতা চুক্তি ছাড়াই শেষ হয় সেই সংলাপ।
এর জেরে পরদিন ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। ওয়াশিংটনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে একই সময়ে ইরানে সামরিক অভিযান ‘অপারেশন রোয়ারিং লায়ন’ শুরু করে ইসরায়েলও।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এ যৌথ সামরিক অভিযানে প্রথম ধাক্কাতেই প্রাণ হারান ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ও তার পরিবার। সেইসঙ্গে হত্যা করা হয় ইরানের সেনাবাহিনীর শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন কমান্ডারকেও। এর জবাবে ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা শুরু করে ইরানও।
প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে চলমান এই হামলা-পাল্টা হামলায় ইতোমধ্যে ভয়ংকর যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে পুরো মধ্যপ্রাচ্য। এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলকে কড়া জবাব দিয়ে এলেও একসঙ্গে সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের দুই শীর্ষ নেতাকে হারানো বড় ধাক্কা হয়েই এসেছে ইরানের জন্য।


মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়েছে.