হরমুজের ‘বিশ’ বিশ্বজুড়ে অস্থিরতা, চরম চাপে দেশের অর্থনীতি
ইবাংলা.প্রেস | ইস্রাফিল হাওলাদার | ঢাকা, ১৯ এপ্রিল ২০২৬
বিশ্ব জ্বালানী মানচিত্রে একটি সরু জলপথ—তবু তার প্রভাব বিস্তৃত মহাদেশজুড়ে মহাদেশ। মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত জলপথ স্ট্রেইট অব হরমুজ-এ সাম্প্রতিক অস্থিরতা বিশ্ব জ্বালানী বাজারের মোট জ্বালানীর প্রায় ২০ শতাংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হওয়ায়, এর সরবরাহে বিঘ্নও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে সুনামির ঢেউ তোলে। এরই ধারাবাহিকতায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় বাংলাদেশে আজ থেকে অকটেন, পেট্রোল ও ডিজেলের নতুন মূল্য কার্যকর হয়েছে, যা দেশের অর্থনীতিতে নতুন করে চাপে পড়তে যাচ্ছে। যা জ্বালানী বিশ্লেষকদের মতে, দেশের অর্থনীতিতে অশনি সংকেত বটে।
আরও পড়ুন…হরমুজ প্রণালি আবারও বন্ধের ঘোষণা দিল ইরান
বিশ্লেষকরা বলছেন, হরমুজ প্রণালী বিশ্ব জ্বালানী সরবরাহ ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ “চোকপয়েন্ট”, যার মাধ্যমে প্রতিদিন কোটি কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল এবং বিপুল পরিমাণ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) পরিবাহিত হয়। এই পথটি মূলত পারস্য উপসাগরীয় তেল রপ্তানির প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে কাজ করে, যার বড় অংশই এশিয়ার বিভিন্ন দেশে পৌঁছে।
মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত প্রণালী স্ট্রেইট অব হরমুজ-এ সাম্প্রতিক অস্থিরতা যেন কঠিন বাস্তবতাকেই নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে জ্বালানী তেলের মূল্যবৃদ্ধি কেবল একটি অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়; বরং বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রতিফলন এবং কিছু কালোবাজারি ও অসাধু জ্বালানী ব্যবসায়ীদের কৃত্রিম সংকটের মচ্ছব। অকটেন, পেট্রোল ও ডিজেলের নতুন মূল্য কার্যকর হওয়ার মধ্য দিয়ে দেশের বাজারে চাপের নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে।
যদিও হরমুজ প্রণালীকে শুধু একটি ভৌগোলিক অবস্থান দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না; এটি বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যের কেন্দ্রবিন্দু। পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর বিপুল তেল ও গ্যাস এই সংকীর্ণ পথ অতিক্রম করে এশিয়ার শিল্পোন্নত অর্থনীতিগুলোতে পৌঁছে।
বিশ্লেষকদের ভাষায়, এটি একটি “চোকপয়েন্ট”—যেখানে প্রবাহ থেমে গেলে পুরো ব্যবস্থাই থমকে যায়। প্রতিদিন কোটি কোটি ব্যারেল জ্বালানী এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়, যা বিশ্ব অর্থনীতির রক্তস্রোতের মতো কাজ করে। হরমুজের ‘বিশ’ শতাংশের ভেতরে লুকানো বৈশ্বিক বাস্তবতা
সংখ্যাটি মাত্র ২০ শতাংশ—তবু কেন এত বড় সংকট?
প্রথমত, বিশ্ব জ্বালানী বাজারে সরবরাহ ও চাহিদার ব্যবধান অত্যন্ত সূক্ষ্ম। এই ভারসাম্যে সামান্য পরিবর্তনও মূল্যবৃদ্ধির ঢেউ তোলে। দ্বিতীয়ত, এই ২০ শতাংশের বড় অংশই এশিয়ামুখী—যেখানে দ্রুত শিল্পায়ন ও জনসংখ্যার চাহিদা জ্বালানী নির্ভরতা বাড়িয়েছে। তৃতীয়ত, বিকল্প উৎস থাকলেও তা তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর করা যায় না। নতুন রুট, পাইপলাইন কিংবা উৎপাদন বাড়াতে সময় ও বিনিয়োগ প্রয়োজন।চতুর্থত, বাজার মনস্তত্ত্ব এখানে বড় ভূমিকা রাখে। সরবরাহ সংকটের আশঙ্কায় দেশ ও করপোরেশনগুলো মজুত বাড়াতে শুরু করে, ফলে বাস্তব ঘাটতির চেয়েও বড় সংকট তৈরি হয়। বাংলাদেশের অর্থনীতি এই বৈশ্বিক অস্থিরতার বাইরে নয়; বরং তার অন্যতম স্পর্শকাতর অংশ। জ্বালানী আমদানির ওপর নির্ভরশীলতা দেশের অর্থনীতিকে এমনিতেই ঝুঁকির মুখে রাখে।
বৈশ্বিক তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাওয়া জ্বালানীর প্রায় ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশই এশিয়ামুখী, যার মধ্যে চীন, ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া সবচেয়ে বড় আমদানিকারক দেশ। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ তুলনামূলকভাবে কম নির্ভরশীল হলেও বৈশ্বিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির কারণে তারাও পরোক্ষভাবে প্রভাবিত হচ্ছে।
আরও পড়ুন…সমুদ্রপথে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সবচেয়ে প্রাণঘাতী বছর ২০২৫: ইউএনএইচসিআর
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বের বাকি প্রায় ৮০ শতাংশ জ্বালানী অন্যান্য উৎস থেকে সরবরাহ হলেও তা হঠাৎ করে বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব নয়। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, আফ্রিকা ও অন্যান্য অঞ্চল থেকে উৎপাদিত জ্বালানী পরিবহন ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে তাৎক্ষণিকভাবে ঘাটতি পূরণে সক্ষম নয়। ফলে হরমুজে সরবরাহ বিঘ্নিত হলে বৈশ্বিক বাজারে সরবরাহ-চাহিদার ভারসাম্য ভেঙে পড়ে এবং তেলের দাম দ্রুত বৃদ্ধি পায়।
এছাড়া সংকটকালীন সময়ে বাজারে অনিশ্চয়তা ও আতঙ্ক বৃদ্ধি পায়, যার ফলে বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক কোম্পানি অতিরিক্ত জ্বালানী মজুত করতে শুরু করে। এতে বাস্তব ঘাটতির পাশাপাশি কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই সংকটের প্রভাব আরও স্পষ্ট। দেশটি প্রায় সম্পূর্ণভাবে আমদানিনির্ভর জ্বালানী ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানিকৃত তেল ও গ্যাসের বড় অংশ হরমুজ প্রণালী হয়ে দেশে আসে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতার সরাসরি প্রভাব দেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানী বাজারে পড়ছে।
জ্বালানীর মূল্য বৃদ্ধির ফলে পরিবহন খাতে ব্যয় বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি নিত্যপণ্যের দামে চাপ তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ায় ভবিষ্যতে শিল্প উৎপাদনেও এর প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বৃদ্ধি পাওয়ায় সামষ্টিক অর্থনীতিতেও অস্থিরতা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। বিশেষ করে আমদানিনির্ভর অর্থনীতির দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। তারা জ্বালানী উৎস বৈচিত্র্যকরণ, নবায়নযোগ্য শক্তিতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কৌশলগত মজুত গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।
সব মিলিয়ে হরমুজ প্রণালীর এই অস্থিরতা আবারও প্রমাণ করেছে যে বৈশ্বিক জ্বালানী ব্যবস্থা কতটা পারস্পরিক নির্ভরশীল এবং সংবেদনশীল। একটি সরু জলপথে বিঘ্ন ঘটলেই তার প্রভাব পৌঁছে যাচ্ছে হাজার হাজার মাইল দূরের অর্থনীতিতে, যার সরাসরি অভিঘাত পড়ছে বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর।
হরমুজ প্রণালীর “বিশ”—এই ২০ শতাংশই আজ প্রমাণ করে দিয়েছে, বৈশ্বিক অর্থনীতি কতটা আন্তঃনির্ভরশীল। একটি সংকীর্ণ জলপথে অস্থিরতা সৃষ্টি হলে তার ঢেউ পৌঁছে যায় হাজার মাইল দূরের বাজারে, এমনকি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে। বাংলাদেশে জ্বালানীর মূল্যবৃদ্ধি সেই বৈশ্বিক বাস্তবতারই প্রতিফলন—যেখানে ভূরাজনীতি, অর্থনীতি এবং মানুষের জীবনযাত্রা একসূত্রে গাঁথা।
ইবাংলা.প্রেস/ বাএ


মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়েছে.