বাংলাদেশে হামের টিকা অকার্যকর হওয়ার প্রমাণ মেলেনি: আইসিডিডিআরবি

ইবাংলা.প্রেস | নিজস্ব প্রতিবেদক | ০২ আগস্ট ২০২৬

বাংলাদেশে বর্তমানে ছড়িয়ে পড়া হাম (মিজলস) ভাইরাসে এমন কোনো জিনগত পরিবর্তনের প্রমাণ পাওয়া যায়নি, যা বিদ্যমান হাম-রুবেলা (এমআর) টিকার সুরক্ষা কমিয়ে দেয়। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি)-এর এক প্রাথমিক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে।

Islami Bank

গবেষণায় বলা হয়েছে, দেশে চলমান হামের বড় প্রাদুর্ভাবের কারণে অনেকের মধ্যে টিকার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হলেও প্রাপ্ত তথ্য সেই আশঙ্কাকে সমর্থন করে না।

বরং যেসব শিশু সুপারিশকৃত দুই ডোজ টিকা গ্রহণ করেছে, তাদের মধ্যে হাম শনাক্তের হার তুলনামূলকভাবে কম পাওয়া গেছে। জিনগত বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়া ভাইরাসটি বি৩ (B3) জিনোটাইপের, যা বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও আগে শনাক্ত হয়েছে।

আরও পড়ুন…দুবাইয়ের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন বেনজীর

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (ডিজিএইচএস) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে ২৫ জুলাই পর্যন্ত দেশে ১ লাখ ২২ হাজার ৭৬৩টি সন্দেহভাজন হামের রোগী শনাক্ত হয়েছে।

এর মধ্যে পরীক্ষাগারে ১৫ হাজার ২৭২টি সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছে। একই সময়ে হাম-সম্পর্কিত ৭২১টি সন্দেহভাজন এবং ৯৫টি নিশ্চিত মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে।

আইসিডিডিআর,বি ও বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট (বিএসএইচঅ্যান্ডআই)-এর গবেষকরা ২০ এপ্রিল থেকে ২১ মে পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি ১৪ বছর বা তার কম বয়সী ৩৪১ শিশুর ওপর গবেষণা চালান।

পরীক্ষায় ৩২৪ শিশুর হাম নিশ্চিত হয়। আক্রান্তদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিল ৩ থেকে ৮ মাস বয়সী শিশু। এ বয়সের ১৩৭ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে।

গবেষণায় দেখা যায়, ৯ মাসের কম বয়সী, অর্থাৎ নিয়মিত টিকা নেওয়ার বয়স হয়নি—এমন ১৪৬ শিশুর মধ্যে ১৪২ জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে, যা ৯৭ শতাংশ। আবার টিকা নেওয়ার বয়স হলেও কোনো ডোজ না পাওয়া ১২৬ শিশুর মধ্যে ১২২ জন বা ৯৭ শতাংশ আক্রান্ত হয়েছে।

এক ডোজ টিকা নেওয়া ৪৮ শিশুর মধ্যে ৪৪ জন বা ৯২ শতাংশ এবং দুই ডোজ টিকা নেওয়া ২১ শিশুর মধ্যে ১৬ জন বা ৭৬ শতাংশের শরীরে হাম নিশ্চিত হয়েছে।

তবে গবেষকরা স্পষ্ট করেছেন, এর অর্থ এই নয় যে দুই ডোজ টিকা নেওয়া সব শিশুর ৭৬ শতাংশ হামে আক্রান্ত হচ্ছে। গবেষণাটি শুধুমাত্র হাসপাতালে হামের সন্দেহে ভর্তি শিশুদের ওপর পরিচালিত হয়েছে।

ফলে এই হার পুরো জনগোষ্ঠীর জন্য প্রযোজ্য নয়। বরং টিকা না পাওয়া শিশুদের তুলনায় দুই ডোজ টিকাপ্রাপ্ত শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ কম পাওয়া গেছে, যা টিকার সুরক্ষামূলক ভূমিকার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

আইসিডিডিআর,বির সংক্রামক রোগ বিভাগের ভাইরোলজি ল্যাবরেটরির অ্যাসোসিয়েট সায়েন্টিস্ট ড. নূরজাহান মালিহা বলেন, এত বড় প্রাদুর্ভাবের কারণে মানুষের মধ্যে টিকা এখনও কার্যকর কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

one pherma

তবে তাদের গবেষণায় ভাইরাস টিকার সুরক্ষা ভেঙে ফেলেছে—এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। যদিও জাতীয় পর্যায়ে টিকার কার্যকারিতা নির্ধারণের জন্য আরও বড় পরিসরের গবেষণা প্রয়োজন।

গবেষণায় ভাইরাসের ৫৫টি পূর্ণাঙ্গ জিনোম বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৮টি নমুনা আইসিডিডিআর,বি এবং ৩৭টি নমুনা রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) সিকোয়েন্স করেছে।

বিশ্লেষণে ভাইরাসের এইচ (H) প্রোটিনে চারটি মিউটেশন শনাক্ত হলেও গবেষকদের মতে, এসব পরিবর্তন ভাইরাসকে টিকার বিরুদ্ধে প্রতিরোধী করে তুলেছে—এমন কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। হাম এখনও একটি একক সেরোটাইপের রোগ এবং টিকার মাধ্যমে তৈরি অ্যান্টিবডি ভাইরাসের একাধিক অংশকে শনাক্ত করতে সক্ষম।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, বাংলাদেশে ৯ মাস বয়সে প্রথম এবং ১৫ মাস বয়সে দ্বিতীয় এমআর টিকা দেওয়ার আগে শিশুরা মূলত মায়ের শরীর থেকে পাওয়া অ্যান্টিবডির ওপর নির্ভরশীল থাকে।

তবে আগের একটি জন্ম-কোহর্ট গবেষণার সংরক্ষিত নমুনা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, মায়ের কাছ থেকে পাওয়া এই অ্যান্টিবডি জন্মের কয়েক মাসের মধ্যেই দ্রুত কমে যায়।

ছোট পরিসরের ওই বিশ্লেষণে ৩ থেকে ৮ মাস বয়সী শিশুদের মধ্যে কার্যকর প্রতিরোধী অ্যান্টিবডি পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে আরও বড় পরিসরে গবেষণা চলছে।

আইসিডিডিআর,বির সংক্রামক রোগ বিভাগের সিনিয়র পরিচালক ড. মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, হাম প্রতিরোধ এবং গুরুতর অসুস্থতার ঝুঁকি কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো টিকাদান।

একই সঙ্গে এত বেশি টিকাদানের হার থাকার পরও কেন এত বড় প্রাদুর্ভাব ঘটেছে, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।ভাইরোলজি ল্যাবরেটরির সহকারী বিজ্ঞানী ড. কামরুন নাহার বলেন, কেন কিছু শিশু টিকা থেকে বাদ পড়ে যাচ্ছে এবং কোথায় রোগ প্রতিরোধে ঘাটতি রয়েছে, তা শনাক্ত করা জরুরি। এসব তথ্য ভবিষ্যতে দেশের টিকাদান কর্মসূচি আরও কার্যকর করতে সহায়তা করবে।

আইসিডিডিআর,বির নির্বাহী পরিচালক ড. তাহমীদ আহমেদ বলেন, এই প্রাথমিক গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্নের উত্তর দিলেও এখনও অনেক বিষয় জানার বাকি রয়েছে।

তাই সংস্থাটি বর্তমানে দেশব্যাপী আরও বিস্তৃত গবেষণা, জিনোম নজরদারি, জন্ম-কোহর্ট ইমিউনোলজি গবেষণা এবং হামে আক্রান্ত শিশুদের সুরক্ষা নিয়ে নতুন গবেষণা শুরু করেছে।

গবেষকরা অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, হাম-রুবেলা টিকা নেওয়া কোনোভাবেই বিলম্বিত বা এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী শিশুদের বয়সভিত্তিক সব ডোজ সম্পন্ন করলেই হাম প্রতিরোধ এবং গুরুতর জটিলতার ঝুঁকি সবচেয়ে কার্যকরভাবে কমানো সম্ভব।

ইবাংলা বাএ

মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়েছে.

Contact Us