জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে তীব্র দাবদাহের প্রকোপ বাড়তে থাকায় গর্ভাবস্থা, সন্তান জন্মদান ও মাতৃস্বাস্থ্য নতুন করে বড় ঝুঁকির মুখে পড়ছে বলে সতর্ক করেছেন জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক নির্বাহী সচিব সাইমন স্টিল। তিনি বলেছেন, জলবায়ু সংকটের প্রভাব এখন জীবনের সবচেয়ে নাজুক পর্যায়গুলোর ওপরও স্পষ্টভাবে পড়ছে।
সোমবার ফিজিতে ‘বার্থরাইট!’ শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে তিনি এ সতর্কবার্তা দেন। অস্ট্রেলিয়া ও ফিজির যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত প্রি-কপের প্রথম দিনে ওয়েলকামের আয়োজনে অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হয়।
সাইমন স্টিল বলেন, তীব্র দাবদাহের প্রকোপ যত বাড়ছে, গর্ভাবস্থা ও সন্তান জন্মদান ততই বৈশ্বিক জলবায়ু সংকটের একটি নতুন ঝুঁকিপূর্ণ ক্ষেত্রে পরিণত হচ্ছে। পরিস্থিতি সম্ভাব্য প্রাণঘাতীও হতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি।
আরও পড়ুন…হকার বসতে দেওয়া হবে না ঢাকার সব স্থানে
তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনকে কখনোই গর্ভাবস্থা ও সন্তান প্রসবকে কম নিরাপদ করে তোলার কারণ হিসেবে মেনে নেওয়া উচিত নয়। একটি নবজাতকের সুস্থ সূচনা কোনো পরিবারের তীব্র তাপ থেকে নিজেদের রক্ষা করার সক্ষমতার ওপর নির্ভর করতে পারে না।ওয়েলকামের উদ্যোগে অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল, ভারত, যুক্তরাজ্য ও জিম্বাবুয়ের ১ হাজার মাতৃস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের ওপর পরিচালিত নতুন এক জরিপের তথ্য তুলে ধরেন জাতিসংঘের এই কর্মকর্তা।
জরিপে অংশ নেওয়া ৯৮ শতাংশ স্বাস্থ্যকর্মী জানিয়েছেন, তারা এমন কোনো গর্ভবতী নারীর সেবা দিয়েছেন, যার স্বাস্থ্য তীব্র দাবদাহের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে তারা মনে করেন। একইভাবে ৯৯ শতাংশ জানিয়েছেন, তারা এমন কোনো শিশুর সেবা দিয়েছেন, যার স্বাস্থ্যও তীব্র তাপের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে তাদের ধারণা।
এ ছাড়া ৭৩ শতাংশ স্বাস্থ্যকর্মী জানিয়েছেন, গত পাঁচ বছরে তাপমাত্রাজনিত স্বাস্থ্য সমস্যা বা জটিলতার ঘটনা বেড়েছে। ৮১ শতাংশের বেশি উত্তরদাতা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যে, অতিরিক্ত পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে চরম তাপপ্রবাহ মা, গর্ভস্থ শিশু ও নবজাতকদের স্বাস্থ্যের জন্য আরও বড় ঝুঁকি তৈরি করবে।
ওয়েলকামের প্রকাশিত বৈজ্ঞানিক তথ্য অনুযায়ী, তাপমাত্রা প্রতি ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়ার সঙ্গে অকাল প্রসবের হার ৫ শতাংশ এবং গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের হার ৭ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ার সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
সাইমন স্টিল বলেন, ‘‘যখন যাওয়ার মতো কোনো শীতল স্থানই নেই, তখন ঠান্ডা পরিবেশে থাকার কোনো সুযোগ থাকে না।’’ তিনি বলেন, ভৌগোলিক অবস্থান, আয় ও স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সুযোগ অনেক ক্ষেত্রেই নিরাপদ সন্তান প্রসবের ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখে।
যথাযথ পদক্ষেপ না নিলে চরম তাপপ্রবাহ এই বৈষম্য আরও বাড়িয়ে দেবে।জাতিসংঘের নির্বাহী সচিব আরও বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবকে বিশ্বের প্রসূতি বিভাগ ও পরিবারগুলোর জন্য স্থায়ী সংকটে পরিণত হতে দেওয়া যাবে না।
তিনি গর্ভাবস্থা ও নবজাতকের যত্নকে জলবায়ু অভিযোজন, তাপপ্রবাহ মোকাবিলা ও স্বাস্থ্য পরিকল্পনার অংশ করার আহ্বান জানান। পাশাপাশি তাপপ্রবাহের আগেই সতর্কতা ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ, নিরাপদ চিকিৎসাকেন্দ্র, পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন।সাইমন স্টিল বলেন, ঝুঁকি কোথায় বাড়ছে, কোন পদক্ষেপ কার্যকর হচ্ছে এবং কোন জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে—তা শনাক্ত করতে আরও তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
তিনি উন্নয়নশীল দেশগুলোর অভিযোজন অর্থায়ন বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন। একই সঙ্গে জলবায়ু-সহনশীল স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং পরিচ্ছন্ন, সাশ্রয়ী ও নিরাপদ জ্বালানিতে দ্রুত রূপান্তরের ওপর গুরুত্ব দেন।
ফিজিতে অনুষ্ঠিত প্রি-কপ বৈঠকে ৫০টিরও বেশি দেশের মন্ত্রী ও প্রতিনিধিরা অংশ নিচ্ছেন। ৫ থেকে ৮ অক্টোবর পর্যন্ত অনুষ্ঠিতব্য এই বৈঠকটি তুরস্কের আন্তালিয়ায় অনুষ্ঠেয় কপ৩১-এর আগে সর্বশেষ গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকগুলোর একটি।
প্রি-কপে ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা সীমা বজায় রাখা, পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে রূপান্তর ত্বরান্বিত করা, জলবায়ু অর্থায়ন বাড়ানো, সমুদ্র ও মহাসাগর রক্ষা এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধির বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে।
সাইমন স্টিল বলেন, সকল সংস্কৃতিতেই একটি শিশুর জন্ম মূল্যবান। তাই জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে গর্ভাবস্থা ও সন্তান জন্মদানকে কম নিরাপদ হয়ে ওঠাকে কোনোভাবেই স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নেওয়া উচিত নয়।তিনি বলেন, একটি নবজাতকের সুস্থ সূচনা কখনোই কোনো পরিবারের তীব্র গরম থেকে বাঁচার সক্ষমতার ওপর নির্ভর করা উচিত নয়।