সফল হয়েছে পরমাণু বিক্রিয়া রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে

ইবাংলা.প্রেস | নিজস্ব প্রতিবেদক | ১১ অক্টোবর ২০২৬

বাংলাদেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রূপপুরে প্রথমবারের মতো সফলভাবে নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিক্রিয়া (ক্রিটিক্যালিটি) সম্পন্ন হয়েছে। এর মাধ্যমে দেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের ইতিহাসে এক নতুন ও ঐতিহাসিক মাইলফলক উন্মোচিত হলো।রোববার (১১ অক্টোবর) বিকেলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব আনোয়ার হোসেন ঐতিহাসিক এ সাফল্য অর্জনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

এর আগে, বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) বিকেলে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিক্রিয়া শুরুর অনুমোদন দেয় বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (বায়রা)। বায়রা চেয়ারম্যান মাহমুদুল হাসান বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেন।

আরও পড়ুন…হামে আরও ৭ শিশুর মৃত্যু

বায়রার চেয়ারম্যান এম মাহমুদুল হাসান বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের চেয়ারম্যান ড. এম মইনুল হোসেন এবং নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের (এনপিসিবিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. জায়েদুল হাসানের কাছে ফিজিক্স টেস্ট শুরুর জন্য প্রয়োজনীয় লাইসেন্স হস্তান্তর করেন।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, এই অনুমোদনের ফলে রূপপুরের প্রথম ইউনিটে রিঅ্যাক্টরের ফিজিক্যাল স্টার্ট-আপ প্রক্রিয়া শুরুর ক্ষেত্রে আর বড় কোনো বাধা নেই। এ পর্যায়ে রিঅ্যাক্টরে প্রথমবারের মতো নিয়ন্ত্রিত ও স্বয়ংসম্পূর্ণ পারমাণবিক চেইন রিঅ্যাকশন শুরু করা হবে।

এরইমধ্যে প্রথম ইউনিটের প্রেসারাইজড অপারেটেড রিলিফ ভালভ (পিওআরভি/পিওএসভি) ব্যবস্থার সব পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাধা অতিক্রম করেছে কেন্দ্রটি।

এর আগে গত ৩০ সেপ্টেম্বর ১৬ দশমিক ১ এমপিএ চাপ ও ২৮০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় পিওআরভি/পিওএসভি ব্যবস্থার ১২টি পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন করা হয়। পরবর্তী ধাপে ১৮ দশমিক ৬৫ এমপিএ চাপে পরীক্ষায় প্রাথমিকভাবে কিছু সমস্যা দেখা দিলেও পরে তা সফলভাবে সম্পন্ন হয়।

এনপিসিবিএলের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বুধবার (৭ অক্টোবর) রাতে জানান, নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন সাপেক্ষে আগামী ডিসেম্বরের শেষ নাগাদ পরীক্ষামূলকভাবে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হতে পারে।

প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এখন শুরু হবে ‘ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি’। এ পর্যায়ে রিঅ্যাক্টরকে তার নির্ধারিত তাপীয় ক্ষমতার এক শতাংশেরও কম শক্তিস্তরে পরিচালনা করা হবে। রিঅ্যাক্টরের গুরুত্বপূর্ণ পরামিতি, নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও নিয়ন্ত্রণ সরঞ্জামের কার্যকারিতা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রূপপুরের পরবর্তী বড় মাইলফলক হলো ‘ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি’। ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটিসহ পুরো ফিজিক্যাল স্টার্ট-আপ প্রক্রিয়ায় ৩০-৪০ দিন সময় লাগতে পারে। ফলাফল সন্তোষজনক হলে ধাপে ধাপে রিঅ্যাক্টরের ক্ষমতা বাড়ানো হবে।

ফিজিক্যাল স্টার্ট-আপের পর কেন্দ্রটি ‘পাওয়ার স্টার্ট-আপ’ পর্যায়ে প্রবেশ করবে। এ পর্যায়ে ধীরে ধীরে রিঅ্যাক্টরের ক্ষমতা বাড়ানো, টারবাইনের সঙ্গে সমন্বয় এবং শেষ পর্যন্ত জেনারেটরকে জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে সংযুক্ত করা হবে। এজন্য অপারেটিং সংস্থাকে বায়রার কাছ থেকে ট্রায়াল অপারেশনাল লাইসেন্স নিতে হবে।

এ পুরো প্রক্রিয়ায় রিঅ্যাক্টর, টারবাইন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয়ের পাশাপাশি বায়রা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডসংশ্লিষ্ট সংস্থা, নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সামরিক বাহিনী এবং নিউক্লিয়ার ইমার্জেন্সি ম্যানেজমেন্ট সংস্থাসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় প্রয়োজন হবে।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রথম ইউনিটকে প্রাথমিকভাবে কম শক্তিতে জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে সংযুক্ত করে ধাপে ধাপে উৎপাদন ক্ষমতা ২০ থেকে ২৫ শতাংশে উন্নীত করা হবে। গ্রিডে সংযোগের পর পরীক্ষামূলক উৎপাদন সাত থেকে আট মাস পর্যন্ত চলতে পারে।

বাণিজ্যিকভাবে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হলে বাংলাদেশ পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী দেশের তালিকায় যুক্ত হবে। এর মাধ্যমে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক সৃষ্টি হবে।

রূপপুর প্রকল্পের মূল মেয়াদ ছিল ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। দুই দফায় মেয়াদ বাড়িয়ে তা ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী মেয়াদ বাড়ানোর কারণে প্রকল্প ব্যয় বাড়ার সুযোগ না থাকলেও ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধির কারণে ব্যয় প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকা বেড়েছে। বর্তমানে প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে এক লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা।

ইবাংলা বাএ

পারমাণবিকবিদ্যুৎকেন্দ্রেরূপপুর