দুদকের তিন জেলায় অভিযানে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রমাণ

ইবাংলা.প্রেস | নিজস্ব প্রতিবেদক | ১২ আগস্ট ২০২৫

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) এনফোর্সমেন্ট ইউনিট আজ সোমবার (১১ আগস্ট ২০২৫) দেশের তিনটি ভিন্ন জেলায় পৃথক অভিযানে বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র উদঘাটন করেছে।

এই অভিযানে পটুয়াখালীর কুয়াকাটা, কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী এবং রাজধানী ঢাকার স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতির নানা প্রমাণ পাওয়া গেছে। অভিযানের লক্ষ্য ছিল জনস্বার্থ রক্ষা, সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং সেবা খাতে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনা।

পটুয়াখালী – কুয়াকাটায় মেরিন ড্রাইভ সড়ক নির্মাণে গুরুতর অনিয়ম:
প্রথম অভিযান পরিচালিত হয় পটুয়াখালী জেলার কুয়াকাটা পৌরসভা এলাকায়। ৪ কোটি ৭৫ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত ১,৩০০ মিটার দীর্ঘ মেরিন ড্রাইভ সড়ক নির্মাণে নানাবিধ অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়, পটুয়াখালী থেকে একটি এনফোর্সমেন্ট টিম ঘটনাস্থলে গিয়ে সরেজমিনে পরিদর্শন করে।

প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, সড়কটি অপরিকল্পিতভাবে নির্মিত হয়েছে। সমুদ্রের ঢেউ থেকে রক্ষার জন্য কোনো রিটেইনিং ওয়াল, জিও ব্যাগ বা কংক্রিট ব্লক স্থাপন করা হয়নি। এর ফলে নির্মাণের অল্প সময়ের মধ্যেই সড়কের একাংশ সমুদ্রের ঢেউয়ে বিলীন হয়ে গেছে এবং অবশিষ্ট অংশও ধীরে ধীরে ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে।

আরও পড়ুন…প্রস্তুত বাংলাদেশ জাতীয় নির্বাচনের জন্য: প্রধান উপদেষ্টা

স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকরা এ ধরনের নিম্নমানের ও পরিকল্পনাহীন কাজের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। দুদক জানায়, এ সংক্রান্ত বিস্তারিত প্রতিবেদন কমিশনে দাখিল করে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কুড়িগ্রাম – স্বাস্থ্যসেবায় অব্যবস্থাপনা ও অতিরিক্ত ভাড়া আদায়:
দ্বিতীয় অভিযান পরিচালিত হয় কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। অভিযোগ ছিল রোগীদের চিকিৎসা সেবায় অনিয়ম, সরকারি এম্বুলেন্সে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, ওয়ার্ডে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং হাসপাতালের ভেতরে ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের অননুমোদিত প্রবেশ।

দুদকের টিম ছদ্মবেশে হাসপাতালে প্রবেশ করে। রোগীর আত্মীয় সেজে একজন সদস্য এম্বুলেন্স ড্রাইভারকে ফোন দিলে, তিনি নিজে না এসে অন্য একজনকে পাঠান। ওই ড্রাইভার নাগেশ্বরী থেকে কুড়িগ্রাম সদর হাসপাতালে রোগী পরিবহনের জন্য নিয়মবহির্ভূতভাবে ১,৩০০ টাকা দাবি করেন।

ওয়ার্ড পরিদর্শনে দেখা যায়, ওয়াশরুমগুলো অত্যন্ত নোংরা ও অপরিচ্ছন্ন। রোগীর খাবার পর্যবেক্ষণে রান্না করা মাছের প্রতিটি টুকরার ওজন নির্ধারিত ১৪০ গ্রামের পরিবর্তে মাত্র ৩৪ গ্রাম পাওয়া যায়। এ বিষয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন।

এছাড়া, অভিযানের সময় প্রায় ১৫–২০ জন ওষুধ কোম্পানির সেলস রিপ্রেজেন্টেটিভকে হাসপাতালে পাওয়া যায়, যাদের উপস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়মবহির্ভূত। জিজ্ঞাসাবাদে দুইজন বিষয়টি স্বীকার করে এবং লিখিত মুচলেকায় ভবিষ্যতে এমন কার্যক্রম থেকে বিরত থাকার প্রতিশ্রুতি দেয়। হাসপাতালে উপস্থিত রোগী ও স্বজনরা দুদকের এ পদক্ষেপকে স্বাগত জানান।

ঢাকা – স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের নির্মাণ ও বরাদ্দে অনিয়ম:
তৃতীয় অভিযান পরিচালিত হয় রাজধানীর মহাখালী এলাকায় গণপূর্ত মহাখালী বিভাগের অধীনস্থ একাধিক প্রকল্পে। অভিযোগ ছিল—

মহাখালী নার্সিং কলেজের সামনের রাস্তার উন্নয়ন কাজে অনিয়ম।

প্রকল্পে দ্বৈত বরাদ্দ এনে অর্থ আত্মসাৎ।

জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট, জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের বিভিন্ন নির্মাণ ও সংস্কার কাজে কাগজে-কলমে প্রকল্প দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ।

দুদকের প্রধান কার্যালয় থেকে পাঠানো এনফোর্সমেন্ট টিম সরেজমিনে গিয়ে নিম্নলিখিত অনিয়ম চিহ্নিত করে—

রোগীদের জন্য নির্মিত শেড তালাবদ্ধ এবং সেখানে কোনো রোগী বসতে পারছে না। ভেতরে কোনো ফ্যানও নেই, ফলে রোগীরা হাসপাতালের ফ্লোরে বসে থাকতে বাধ্য হচ্ছেন।

স্থাপিত পানির ফিল্টার দীর্ঘদিন অচল অবস্থায় পড়ে আছে।

মাত্র এক বছর আগে নির্মিত স্টোর রুমের ছাদ বৃষ্টির পানিতে চুইয়ে পড়ছে।

আনসার সদস্যদের থাকার জন্য বানানো শেডে বৈদ্যুতিক সংযোগের কাজ অসমাপ্ত রয়েছে।

স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, এসব অবকাঠামোগত ত্রুটি ও অব্যবস্থাপনা সরকারি অর্থের অপচয়ের স্পষ্ট উদাহরণ।

ইবাংলা বাএ

অনিয়মদুর্নীতিরপ্রমাণ