পরিশ্রমের ঘাম শুকায়, কিন্তু বদলায় না ভাগ্য আশকোনায় শ্রমিকদের আক্ষেপ

মতিন সাগর

রাজধানীর দক্ষিণখান আশকোনা এলাকায় প্রতিদিন সকালে গলিপথে ভিড় করে দাঁড়ান অসংখ্য দিনমজুর ও রাজমিস্ত্রির সহকারী শ্রমিকরা। কারও হাতে কোদাল, কারও হাতে বাঁশ-রশি, সবাই অপেক্ষায় থাকেন দিনের কাজের আশায়।

কাজ পেলে দিন শেষে তিন বেলা ভাতের নিশ্চয়তা মেলে, না পেলে পরিবার চালানোই হয়ে পড়ে কঠিন। কিন্তু দীর্ঘ দিনের পরিশ্রম সত্ত্বেও জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন হচ্ছে না, বরং দিন দিন বাড়ছে হতাশা।

রাজমিস্ত্রির হেল্পার বাবুল মিয়া (৪৫) দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বলেন, “মানুষ ভাবে, পরিশ্রম করলে ভাগ্য বদলায়। কিন্তু আমার জীবনে সেটা হলো না। ছোটবেলা থেকেই খেটে খাচ্ছি।

পরিশ্রমের বিনিময়ে শুধু তিন বেলা খেতে পাই, তার বাইরে কিছু নেই। জীবনে কোনো উন্নতি হলো না। বিদেশে গেলে একই পরিশ্রমে ভালো টাকা পাওয়া যায়। কিন্তু বিদেশ যাওয়ার মতো সামর্থ্যই তো নেই।

বাবুল মিয়ার মতো একই আক্ষেপ জানালেন শ্রমিক পারভেজ ও এরশাদ। তাঁদের দাবি, শ্রমিকদের ঘাম ঝরানো কাজেই দেশের উন্নয়ন এগিয়ে যায়, কিন্তু তাদের মজুরি সেই তুলনায় অতি সামান্য।

পারভেজ বলেন, “আমরা দিনরাত পরিশ্রম করি। বিল্ডিং দাঁড় করাই, রাস্তা বানাই, কিন্তু নিজের ঘরটা ভালোভাবে চালাতে পারি না। আমাদের মজুরি যদি না বাড়ে, তাহলে জীবনে কোনো পরিবর্তন আসবে না।

আরও পড়ুন…দেশ পুনর্গঠনে প্রবাসীদের ভূমিকা জরুরি: প্রধান উপদেষ্টা

শ্রমিকদের আক্ষেপ প্রসঙ্গে ডেভেলপার কোম্পানির ইঞ্জিনিয়ার মো. মাসুদুল হাসান টিটু বলেন, বাংলাদেশে শ্রমিকরা যে মজুরি পান, সেটা দিয়ে একটি পরিবারের জীবন নির্বাহ করা প্রায় অসম্ভব।

শ্রমের প্রকৃত মূল্যায়ন করা উচিত। কিন্তু কার্যকর কোনো নীতিমালা না থাকায় শ্রমিকরা ন্যায্য প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। সরকারের সুনির্দিষ্ট উদ্যোগ ছাড়া এই অবস্থা পাল্টানো সম্ভব নয়।

বর্তমানে আশকোনা ও আশপাশের এলাকায় রাজমিস্ত্রিদের সহকারী শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা। অথচ চাল, ডাল, তেল থেকে শুরু করে প্রতিটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় এই মজুরি টিকে না।

এক পরিবারের জন্য মাস শেষে সংসার চালানো হয়ে যায় বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক শ্রমিক বলেন, আয় কম হওয়ায় সন্তানদের ভালো স্কুলে ভর্তি করাতে পারেন না, আবার চিকিৎসার খরচ মেটানোও তাদের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।

এই বাপারে বিশিষ্ট সাংবাদিক জ ই বুলবুল বলছেন, দেশের অর্থনীতি, অবকাঠামো ও উন্নয়নের প্রতিটি ক্ষেত্রেই এ শ্রমিকদের অবদান অপরিসীম। অথচ তাঁদের ন্যায্য মজুরি ও জীবন-মান উন্নয়নে কার্যকর কোনো পরিকল্পনা নেই।

বিদেশে শ্রমের মর্যাদা ও মূল্য বেশি হলেও দেশে তা অবহেলার শিকার। সচেতন মহলের মতেও, শ্রমিকদের জন্য জীবনযাত্রা উপযোগী ন্যূনতম মজুরি নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

আশকোনার শ্রমিকরা প্রতিদিনই আশায় থাকেন- কোনো দিন হয়তো তাদের পরিশ্রমের সঠিক মূল্য দেওয়া হবে। কিন্তু বাস্তবে এখনো সেই দিন আসেনি। হাড়ভাঙা খাটুনি শেষে তারা ফেরেন ভাঙা মন নিয়ে। জীবনের কষ্ট আর ভাগ্য না-বদলানোর আক্ষেপ যেন তাদের স্থায়ী সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ইবাংলা বাএ

আক্ষেপআশকোনায়শ্রমিকদের