যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যম দ্য ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস জানাচ্ছে, যুক্তরাজ্যের অন্তত ৯টি বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের শিক্ষার্থীদের ভর্তির আবেদনের ওপরই সাময়িক বিধিনিষেধ আরোপ করেছে।
ইউনিভার্সিটি অব চেস্টার, ইউনিভার্সিটি অব উলভারহ্যাম্পটন, ইউনিভার্সিটি অব ইস্ট লন্ডন, কভেন্ট্রি ইউনিভার্সিটির মতো বিশ্ববিদ্যালয় আছে এই তালিকায়।
যুক্তরাজ্যের সরকার সম্প্রতি আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ভর্তির ক্ষেত্রে নিয়মকানুনে যে কঠোরতা এনেছে, তারই ধারাবাহিকতায় এসেছে এই সিদ্ধান্ত। নতুন নিয়মে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে প্রমাণ করতে হবে যে শিক্ষার্থীরা আসলেই পড়ার জন্য সে দেশে যাচ্ছে এবং শিক্ষার্থী ভিসাকে চোরাপথ হিসেবে কাজে লাগিয়ে যুক্তরাজ্যে স্থায়ীভাবে থেকে যাওয়ার চেষ্টা করছে না।
কেন হঠাৎ এই নিষেধাজ্ঞা:
যুক্তরাজ্যের হোম অফিসের জারি করা নতুন নিয়ম অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের ভিসা বাতিলের হার ৫ শতাংশের নিচে থাকতে হবে – যা আগে ছিল ১০ শতাংশ। ভর্তির অনুমতি পাওয়া শিক্ষার্থীদের শেষ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার নিয়মেও কঠোরতা এনেছে ইউকে হোম অফিস।
অর্থাৎ, ভর্তির আবেদন গৃহীত হওয়া শিক্ষার্থী আসলেই ভর্তি হলো কি না, কোর্স শেষ করল কি না – এসব নিশ্চিত করতে হবে। কোনো বিশ্ববিদ্যালয় এসব নিয়ম না মানতে পারলে ওই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী নেওয়ার লাইসেন্সও হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
কিন্তু বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্যে ভিসা প্রত্যাখ্যাত হওয়ার হার নির্ধারিত সীমার চেয়ে অনেক ওপরে – ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে এ বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এক বছরে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সংখ্যাটা ২২ শতাংশ, পাকিস্তানের ১৮ শতাংশ।
ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস জানাচ্ছে, এই এক বছরে বিশ্বজুড়ে যে ২৩০৩৬ জন শিক্ষার্থীর ভিসা আবেদন প্রত্যাখ্যান করেছে ইউকে হোম অফিস, তার অর্ধেকই এই দুই দেশের!
আরও পড়ুন…সেতুর উপর গর্ত, ঝুঁকি নিয়ে যান চলাচল
সে কারণে এই দুই দেশের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি নিতে রাজি নয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। ফল – এ দুই দেশের শিক্ষার্থীদের ভর্তির আবেদনই সাময়িকভাবে স্থগিত করে রাখছে বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়।
কোন কোন বিশ্ববিদ্যালয়:
ইউনিভার্সিটি অব চেস্টার: ২০২৬ সালে পাকিস্তানি শিক্ষার্থীদের ভর্তির আবেদন গ্রহণ করবে না।
ইউনিভার্সিটি অব উলভারহ্যাম্পটন: আন্ডারগ্র্যাজুয়েট প্রোগ্রামে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের শিক্ষার্থী নেবে না।
ইউনিভার্সিটি অব ইস্ট লন্ডন: পাকিস্তানি শিক্ষার্থী নেওয়া বন্ধ রেখেছে।
সান্ডারল্যান্ড ও কভেন্ট্রি ইউনিভার্সিটি: বাংলাদেশ ও পাকিস্তানি শিক্ষার্থীদের আবেদনে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।
ইউনিভার্সিটি অব হার্টফোর্ডশায়ার: ২০২৬ সালে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের শিক্ষার্থী নেবে না।
অক্সফোর্ড ব্রুকস: ২০২৬ সালে আন্ডারগ্র্যাড প্রোগ্রামে দুই দেশের শিক্ষার্থীদের আবেদন নেবে না।
লন্ডন মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি: বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের আবেদন বন্ধ রেখেছে।
গ্লাসগো ক্যালেডোনিয়ান ইউনিভার্সিটি: ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর ইনটেইকে দুই দেশের শিক্ষার্থীদের আবেদন গ্রহণ করবে না। তবে ২০২৬ সালে কিছু কোর্সে আবেদনের পথ খোলা আছে।
যুক্তরাজ্য কেন ভিসা নিয়ম কঠোর করেছে:
কিছুদিন আগে যুক্তরাজ্য শরণার্থী ভিসার ওপর ইউরোপে সবচেয়ে কঠোর নিয়ম জারি করেছে, পাশাপাশি ব্রিটেনে বৈধ ভিসা নিয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের স্থায়ী আবাসনের নিয়মও ইউরোপে সবচেয়ে কঠোর করেছে।
একই রকম কঠোর নিয়ম তারা করেছে যুক্তরাজ্যে পড়তে যেতে ইচ্ছুক শিক্ষার্থীদের জন্যও। কারণ, যুক্তরাজ্যে পড়তে যাওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে আশ্রয় চেয়ে ভিসা আবেদনের হার অনেক বেড়েছে।
কিন্তু অভিবাসন নিয়ে ডানপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর নেতিবাচক প্রচারণা ও রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়েছে যুক্তরাজ্যের সরকার। অভিবাসন সমস্যা যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের সব দেশে সাম্প্রতিক সময়ে অনেক বড় আলোচনার বিষয় ও রাজনৈতিক ইস্যু। এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাজ্যের সরকার চায় অভিবাসনের হার কমিয়ে আনতে। তার চাপ পড়েছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওপরও।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে প্রমাণ করতে হবে যে সেখানে ভর্তি হতে যাওয়া আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ভিসার অপব্যবহার করে যুক্তরাজ্যে স্থায়ীভাবে থেকে যাওয়ার চেষ্টা করবে না।
যুক্তরাজ্যের কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, অনেক লোক ‘শিক্ষার্থী’ হিসেবে আবেদন করে যুক্তরাজ্যে ঢোকে, কিন্তু তাদের আসল উদ্দেশ্য থাকে সেখানে দীর্ঘমেয়াদে থেকে যাওয়া এবং কাজ করা।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক:
হোম অফিসের নতুন নিয়মের সঙ্গে তাল মেলাতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের শিক্ষার্থীদের ওপর এমন নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনাও হচ্ছে অনেক। সিদ্ধান্তগুলোর বিপক্ষে যুক্তি, এতে ভিসা পদ্ধতির স্বচ্ছতা নিশ্চিত হলো। অন্য দেশের সত্যিকারের শিক্ষার্থীদের সুযোগ আরও বাড়ল বলেও যুক্তি দেখাচ্ছেন তারা।
আর বিপক্ষের যুক্তি, এতে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সত্যিকারের অনেক শিক্ষার্থীর যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার রাস্তা বন্ধ হয়ে গেল। তাছাড়া র্যাঙ্কিংয়ে নিচের দিকে থাকা যুক্তরাজ্যের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়, যাদের আয়ের বড় অংশ আসে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে, তাদের অস্তিত্বও হুমকির মুখে পড়তে পারে বলে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।