বাংলাদেশ–আজারবাইজান সম্পর্ক: দক্ষিণ এশিয়া ও ককেশাসের মধ্যে একটি কৌশলগত সেতুবন্ধন।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ ও আজারবাইজানের মধ্যকার সম্পর্ক একটি গতিশীল উন্নয়নের পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। ভৌগোলিকভাবে দূরে অবস্থান করলেও, উভয় দেশ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কাঠামোর মধ্যে সহযোগিতা, অর্থনৈতিক সম্পর্ক সম্প্রসারণ এবং রাজনৈতিক সংলাপ জোরদারের লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
আরও পড়ুন…বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া ৯ বিষয়ে একমত
বাংলাদেশ ১৯৯১ সালের ৩০ ডিসেম্বর আজারবাইজানের স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দেয় এবং ১৯৯২ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ আজারবাইজানকে স্বীকৃতি প্রদানকারী প্রথম দিকের দেশগুলোর একটি হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নেয়।
দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্ক পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও আন্তর্জাতিক আইনের নীতিমালার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে আজারবাইজানের আঞ্চলিক অখণ্ডতাকে সমর্থন করে এসেছে এবং কারাবাখ ইস্যুতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাকুর অবস্থানকে সমর্থন করেছে। অপরদিকে, আজারবাইজানও বাংলাদেশের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উদ্যোগে সমর্থন প্রদান করেছে এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোতে বাংলাদেশের প্রার্থিতাকে সমর্থন করেছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উচ্চ পর্যায়ের যোগাযোগ বৃদ্ধির ফলে সম্পর্ক নতুন মাত্রা লাভ করেছে। ২০২৪ সালে বাকুতে দুই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যে প্রথম রাজনৈতিক পরামর্শ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, মানবিক, পর্যটন এবং সংসদীয় সহযোগিতা বৃদ্ধির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদারের বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।
২০২৫ সালে ইস্তাম্বুলে অনুষ্ঠিত ইসলামিক সহযোগিতা সংস্থার (OIC) বৈঠকের ফাঁকে আজারবাইজানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেইহুন বাইরামভ এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. তৌহিদ হোসেনের মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বাণিজ্য, শিক্ষা, ডিজিটাল প্রশাসন এবং ভিসা প্রক্রিয়া সহজীকরণের মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয় আলোচনা করা হয়।
২০২৬ সালে বাংলাদেশ আজারবাইজানের সঙ্গে নিয়মিত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পর্যায়ের পরামর্শ ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব দেয়। একই সঙ্গে উভয় দেশে দূতাবাস স্থাপন, বাণিজ্য বৃদ্ধি এবং জনগণের মধ্যে যোগাযোগ সম্প্রসারণের গুরুত্বও তুলে ধরা হয়।
অর্থনৈতিক সহযোগিতা এখনও সম্ভাবনার পূর্ণ মাত্রায় পৌঁছায়নি, তবে উভয় দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ বিদ্যমান। জ্বালানি, পরিবহন এবং লজিস্টিকস খাতে আজারবাইজানের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য আকর্ষণীয়। অন্যদিকে, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প, হালকা শিল্প এবং শ্রমবাজারের সক্ষমতা আজারবাইজানের আগ্রহের ক্ষেত্র। কাস্পিয়ান অঞ্চল ও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের মধ্যে পরিবহন সংযোগ উন্নয়ন ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করতে পারে।
মানবিক ও শিক্ষাক্ষেত্রেও সহযোগিতা ধীরে ধীরে সম্প্রসারিত হচ্ছে। উভয় দেশ ইসলামিক সহযোগিতা সংস্থা, জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে অভিন্ন স্বার্থের ভিত্তিতে কাজ করছে। সাংস্কৃতিক বিনিময় ও শিক্ষা কর্মসূচি দুই দেশের জনগণের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও বন্ধুত্বকে আরও গভীর করছে।
বর্তমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় বাংলাদেশ–আজারবাইজান সম্পর্ক শুধু দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার উদাহরণ নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ ককেশাসের মধ্যে একটি কার্যকর সহযোগিতা মডেল হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে। পারস্পরিক রাজনৈতিক সদিচ্ছা, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সহযোগিতা এই সম্পর্ককে ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী করার ভিত্তি তৈরি করেছে।
সর্বোপরি, বাংলাদেশ ও আজারবাইজানের সম্পর্ক বন্ধুত্ব, পারস্পরিক সমর্থন এবং যৌথ উন্নয়নের নীতির ওপর ভিত্তি করে নতুন উচ্চতায় পৌঁছাচ্ছে। এই সম্পর্ক কেবল দুই দেশের জন্যই নয়, বরং বৃহত্তর ইউরেশীয় অঞ্চলে সহযোগিতা, স্থিতিশীলতা এবং সমৃদ্ধি বৃদ্ধিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম।
ইবাংলা. প্রেস/ বা এ