ফুটবল পাগল বাংলাদেশ কেন বিশ্ব ফুটবলে এত পিছিয়ে?

ইবাংলা.প্রেস | অদিতি করিম | ২৫ জুন ২০২৬
লেখক: নাট্যকার ও কলাম লেখক।

বাংলাদেশজুড়ে এখন চলছে ফুটবল উন্মাদনা। রাতভর বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা দেখার উৎসব। গোটা দেশ যেন দুই ভাগে বিভক্ত—আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিল। অবশ্য এর বাইরেও কয়েকটি দলের সমর্থকও নেহাতই কম নয়।

এমবাপ্পের ফ্রান্স, রোনালদোর পর্তুগাল, হ্যারি কেইনের ইংল্যান্ড, হাকিমির মরক্কো, চারবারের চ্যাম্পিয়ন জার্মানির সমর্থকও আছেন অনেক। এবারের বিশ্বকাপে দুটি ড্র করে হইচই ফেলে দেওয়া ৬ লাখ মানুষের দেশ কেপ ভার্দের বাংলাদেশি সমর্থক নিশ্চিতভাবেই সে দেশের জনসংখ্যার চেয়ে বেশি।

বাংলাদেশে শহর থেকে গ্রামে বড় স্ক্রিনে খেলা দেখার আয়োজন করা হয়। এই আয়োজনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা। আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের খেলার দিন টিএসসি চত্বর যেন এক টুকরো আর্জেন্টিনা কিংবা ব্রাজিলে রূপ নেয়।

শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই নন, বিভিন্ন স্তরের মানুষও খেলা দেখতে আসেন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। এখানে খেলা দেখতে এসে অনেকেরই মনে হতে পারে, যেন কোনো স্টেডিয়ামে বসে খেলা দেখছেন।

লিওনেল মেসির বিশ্বকাপে গোলের রেকর্ড করার রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুহসীন হলে এসে খেলা উপভোগ করেন বাংলাদেশে নিযুক্ত আর্জেন্টিনার রাষ্ট্রদূত।

আরও পড়ুন…আরও কমে গেল সোনার দাম

এ সময় আর্জেন্টাইন সমর্থকদের উল্লাসের মধ্যে রাষ্ট্রদূত মার্সেলো কার্লোস সেসো বলেন, ‘আমি নিজের দেশের মতো অনুভব করছি। মনে হচ্ছে, আমি আর্জেন্টিনায় আছি।

বিশ্বকাপ উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের প্রায় সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে চলে জমকালো আয়োজন। শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই নয়, পাঁচতারকা হোটেল, বিভিন্ন ক্যাফে ও রেস্তোরাঁতেও চলছে বিশ্বকাপের বিশেষ আয়োজন। বাসাবাড়িতেও রাত জেগে খেলা দেখার ধুম পড়ে যায়। তরুণ-তরুণীরা তাদের প্রিয় দলের জার্সি গায়ে খেলা উপভোগ করেন। অনেকেই পুরো বিশ্বকাপজুড়ে প্রিয় দলের জার্সি পরে থাকেন।

সারা বাংলাদেশ যেন ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার জাতীয় পতাকায় ছেয়ে যায়। এর ফাঁকফোকরে দেখা যায় ফ্রান্স, জার্মানি ও পর্তুগালের পতাকা। কয়েকটি গ্রাম তো আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের পতাকার সাজেই সেজে ওঠে। এই দুই দলের সমর্থকেরা দলের বিজয়ে মিছিল করেন, নিজের পকেটের টাকা খরচ করে মিষ্টি বিতরণ করেন।

অনেকে আবার খেলা উপলক্ষে গরু-খাসি জবাই করে সমর্থকদের আপ্যায়ন করেন। দুই পক্ষের সমর্থকদের মধ্যে উত্তেজনা, এমনকি মারামারির ঘটনাও ঘটে। আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলে ট্রল ও মন্তব্যের প্রতিযোগিতা।

বিশ্বকাপ যেন আমাদের সব ভুলিয়ে দেয় দেড় মাসের জন্য। চারপাশের অভাব-অনটন, অনিশ্চয়তা, হতাশা ও উৎকণ্ঠা পাশে রেখে আমরা মেতে উঠি বিশ্বকাপ উন্মাদনায়। প্রায় ২০ কোটি মানুষের এই দেশে এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর, যিনি ফুটবল পছন্দ করেন না কিংবা বিশ্বকাপ নিয়ে কোনো আগ্রহ নেই। এদেশের মানুষ সত্যিই ফুটবলপাগল। বিশ্বকাপ ফুটবল যেন আমাদের জাতীয় জীবনে এক মহা উৎসবের আমেজ এনে দেয়।

কিন্তু ফুটবলপাগল এই দেশটি কখনো বিশ্বকাপ খেলেনি। বিশ্বকাপ তো দূরের কথা, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ মাত্র একবার, ১৯৮০ সালে, এশিয়ান কাপ ফুটবলে অংশ নিয়েছিল। যদিও নারী ফুটবল দল সাম্প্রতিক সময়ে নারী এশিয়ান কাপে অংশ নিয়েছে।

সাফ ফুটবলও আমাদের জন্য খুব একটা সুখকর নয়। ২০০৩ সালে আমরা চ্যাম্পিয়ন হয়েছিলাম, এরপর আর উল্লেখযোগ্য সাফল্য আসেনি। ফিফা র‌্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ১৮১তম। কোটি ভক্তের এই দেশে ফুটবলের কেন এমন করুণ দশা?

ফিফার এক গবেষণায় বলা হয়েছে, একটি দেশের ফুটবলের বিকাশে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে দর্শক। কোনো দেশে যদি ফুটবল জনপ্রিয় হয়, তাহলে সেই দেশের ফুটবলের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই তত্ত্ব কতটা কার্যকর? এখানে ফুটবল উন্মাদনা ইংল্যান্ড, আর্জেন্টিনা কিংবা ব্রাজিলের সঙ্গে তুলনীয়।

তবুও কেন আমাদের ফুটবল রুগ্ণ ও মৃতপ্রায়? বিশ্বকাপ নিয়ে এত উত্তেজনার মধ্যে এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি।বাংলাদেশের ফুটবল এখনো যে টিকে আছে, তার পেছনে দেশের বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী বসুন্ধরার গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। বসুন্ধরা বাংলাদেশের ফুটবলের অন্যতম প্রধান ভরসা হয়ে উঠেছে।

দুনিয়াজুড়ে ফুটবল সংস্কৃতির মূল ভিত্তি হলো ক্লাব। নতুন প্রতিভা আবিষ্কার, খেলোয়াড় তৈরি, ধারাবাহিক উন্নয়ন এবং খেলাকে জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে ক্লাবগুলোর অবদান অপরিসীম। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, চেলসি, রিয়াল মাদ্রিদ, বার্সেলোনা, আর্সেনাল কিংবা ম্যানচেস্টার সিটির একাডেমিগুলো বিশ্ব ফুটবলে অনুসরণীয় উদাহরণ।

স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে অধিকাংশ ক্লাব কখনো পরিকল্পিতভাবে তৃণমূল পর্যায় থেকে খেলোয়াড় তৈরির উদ্যোগ নেয়নি। ফলে দেশের ফুটবল স্বনির্ভর হতে পারেনি। গত পাঁচ দশকেরও বেশি সময়ের ফুটবল ইতিহাস অনেকাংশেই সম্ভাবনা অপচয়ের গল্প।

এই বাস্তবতায় বসুন্ধরা কিংস বাংলাদেশের ফুটবলে নতুন ধারা নিয়ে আসে। স্বাধীনতার পর এটিই প্রথম ক্লাব, যারা আন্তর্জাতিক মানের পেশাদার ক্লাব কাঠামো অনুসরণ করে ফুটবলের উন্নয়নে কাজ শুরু করে। নির্দিষ্ট লক্ষ্য, পরিকল্পনা ও দীর্ঘমেয়াদি ভাবনা নিয়ে ক্লাবটি শুধু দেশেই নয়, দক্ষিণ এশিয়ার বাইরেও একটি পেশাদার ক্লাব হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।

ঘরোয়া ফুটবলে সাফল্যের ক্ষেত্রে বসুন্ধরা কিংস নতুন ইতিহাস তৈরি করেছে। আধুনিক চিন্তাভাবনা ও পেশাদার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে তারা দেশের ক্লাব ফুটবলে নতুন মানদণ্ড স্থাপন করেছে। দেশের ক্রীড়াঙ্গনের উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার লক্ষ্যেই বসুন্ধরা গ্রুপ বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করে আসছে।

তবে দুঃখজনকভাবে বসুন্ধরার মতো অন্য কোনো বড় শিল্পগোষ্ঠী ফুটবলের উন্নয়নে তেমনভাবে এগিয়ে আসেনি। আবাহনী, মোহামেডান কিংবা ব্রাদার্স ইউনিয়নের মতো ঐতিহ্যবাহী ক্লাবগুলোরও স্থায়ী আয়ের উৎস নেই। চাঁদা কিংবা সীমিত আয়ে ক্লাব পরিচালনা করা গেলেও ফুটবলের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন সম্ভব নয়।

বাংলাদেশে প্রায় ত্রিশটির মতো বড় শিল্পগোষ্ঠী রয়েছে। প্রত্যেকটি যদি একটি করে ক্লাবের দায়িত্ব নেয় এবং বসুন্ধরা কিংসের আদলে ক্লাব গড়ে তোলে, তাহলে দেশের ফুটবলের চিত্র বদলাতে খুব বেশি সময় লাগবে না। এ বিষয়ে শিল্পগোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সরকারেরও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

পাশাপাশি কৈশোর থেকেই ফুটবলার গড়ে তোলার জন্য শক্তিশালী ফুটবল একাডেমি গড়ে তুলতে হবে। এসব একাডেমি সারা দেশ থেকে প্রতিভা খুঁজে এনে তাদের পরিকল্পিত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ভবিষ্যতের ফুটবলার হিসেবে গড়ে তুলবে। বর্তমানে বাংলাদেশে বসুন্ধরা ফুটবল একাডেমি ও বিকেএসপি ছাড়া উল্লেখযোগ্য একাডেমি নেই।

এ ধরনের একাডেমি ছাড়া শুধু ফুটবল নয়, কোনো খেলাতেই টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। সরকারি ও বেসরকারি উভয় পর্যায়েই ক্রীড়া একাডেমি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিতে হবে। যারা এ ধরনের উদ্যোগ নেবে, তাদের বিশেষ প্রণোদনা ও পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া প্রয়োজন।

বাংলাদেশের ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাফুফেকে ফুটবল উন্নয়নে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। বিশ্বের কোনো দেশের ফুটবল কেবল রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বিকশিত হয়নি। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে ক্লাবভিত্তিক ফুটবল উন্নয়নই সবচেয়ে কার্যকর পথ।

বর্তমান যুগের অন্যতম সেরা ফুটবলার লিওনেল মেসিকে নিয়ে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন রয়েছে। কিন্তু মেসিকে তৈরি করেনি আর্জেন্টিনা ফুটবল ফেডারেশন; তাকে গড়ে তুলেছে বার্সেলোনা। শৈশবে গ্রোথ হরমোনজনিত সমস্যায় ভোগা এক কিশোর বার্সেলোনার লা মাসিয়া একাডেমির হাত ধরে বিশ্বের সেরা ফুটবলারদের একজন হয়ে উঠেছেন।

শুধু মেসি নন, বিশ্বের প্রায় সব বড় ফুটবল তারকার উত্থানের কেন্দ্রবিন্দু ছিল তাদের ক্লাব ও একাডেমি। বাংলাদেশের ফুটবলকে নতুন জীবন দিতে হলে তাই ক্লাব ফুটবলের জাগরণ ঘটাতে হবে। বসুন্ধরার মতো আরও আধুনিক ও পেশাদার ক্লাব গড়ে তুলতে হবে। এ ক্ষেত্রে বাফুফে ও সরকারকে সমন্বিত সহযোগিতা দিতে হবে।

একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার আলোকে দেশের ফুটবলকে ঢেলে সাজাতে হবে, নতুন খেলোয়াড় তৈরি করতে হবে এবং সবচেয়ে বড় কথা—খেলাধুলাকে রাজনীতিমুক্ত রাখতে হবে। কোটি কোটি ফুটবলভক্তের এই দেশে ফুটবল এত পিছিয়ে থাকবে, তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।

ইবাংলা বাএ

পাগলফুটবলবাংলাদেশ