চীনের সঙ্গে ডিফার্ড ট্রেড ফাইন্যান্সিং সুবিধার প্রস্তাব
ইবাংলা.প্রেস | নিজস্ব প্রতিবেদক | ২০ জুন ২০২৬

চীনের সঙ্গে ১৮০ দিনের ডিফার্ড ট্রেড ফাইন্যান্সিং চালুর প্রস্তাব, শিল্পখাতে আসতে পারে ১৮ বিলিয়ন ডলারের কার্যকরী মূলধন সুবিধা। বাংলাদেশের শিল্পায়ন, রপ্তানি প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ কমাতে চীনের সঙ্গে একটি বিশেষ দ্বিপাক্ষিক ডিফার্ড ট্রেড ফাইন্যান্সিং ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়েছে।
‘বাংলাদেশ-চীন দ্বিপাক্ষিক ডিফার্ড ট্রেড ফাইন্যান্সিং ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল কম্পিটিটিভনেস এনহ্যান্সমেন্ট প্রোগ্রাম (BCDTF-ICEP)’ শীর্ষক একটি নীতিগত শ্বেতপত্রে (Policy White Paper) এ প্রস্তাবনা তুলে ধরেছেন শিল্প উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক নীতি বিশ্লেষক এবং উদ্যোক্তা ইফতেখার হোসেন।
প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশের শিল্পখাত বর্তমানে উচ্চ সুদের ট্রেড ফাইন্যান্সিং, কাঁচামাল আমদানির ব্যয় বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর ক্রমবর্ধমান চাপের মুখোমুখি।
বিশেষ করে রপ্তানিমুখী শিল্প, তৈরি পোশাক খাতের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্প, উৎপাদনমুখী ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প এবং কাঁচামালনির্ভর উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে।
নীতিপত্রে উল্লেখ করা হয়, ১৯৮০-এর দশকে ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি (Back-to-Back LC) ব্যবস্থা যেমন বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল, তেমনি বর্তমান সময়ে একটি নতুন প্রজন্মের ট্রেড ফাইন্যান্সিং কাঠামো দেশের শিল্পখাতকে আরও শক্তিশালী ভিত্তি দিতে পারে।
চীন থেকে আমদানিনির্ভর শিল্পখাত:
প্রস্তাবনায় বলা হয়, বাংলাদেশের মোট আমদানির একটি বড় অংশ আসে চীন থেকে। টেক্সটাইল কাঁচামাল, সুতা, কাপড়, শিল্প কেমিক্যাল, ডাই স্টাফ, শিল্প যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের প্রধান উৎস দেশটি। অর্থবছর ২০২৪-২৫-এ বাংলাদেশের মোট আমদানির পরিমাণ প্রায় ৬৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে বলে উল্লেখ করা হয়।
বর্তমান ব্যবস্থায় আমদানিকারকদের এলসি খোলার ক্ষেত্রে উচ্চ মার্জিন, পূর্ণাঙ্গ নিরাপত্তা জামানত এবং পরবর্তীতে উচ্চ সুদে এলটিআর (LTR) বা পিএডি (PAD) সুবিধা গ্রহণ করতে হয়। এর ফলে শিল্প প্রতিষ্ঠানের বিপুল পরিমাণ কার্যকরী মূলধন দীর্ঘ সময়ের জন্য আটকে থাকে এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পায়।
আরও পড়ুন…এক জয়েই আবারও সিংহাসনে ব্রাজিল
কী থাকছে প্রস্তাবিত ব্যবস্থায়:
প্রস্তাবিত Bangladesh-China Deferred Trade Financing Facility (BCDTFF)-এর আওতায় বাংলাদেশ সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক People’s Bank of China (PBOC)-এর যৌথ ব্যবস্থাপনায় একটি বিশেষ ট্রেড ফাইন্যান্সিং প্ল্যাটফর্ম গঠনের সুপারিশ করা হয়েছে।
এই ব্যবস্থায় চীনা রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের পণ্যের মূল্য তাৎক্ষণিকভাবে পেয়ে যাবে, অন্যদিকে বাংলাদেশি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো ১৮০ দিন বা ছয় মাস পর অর্থ পরিশোধের সুযোগ পাবে। অর্থায়নের উৎস হিসেবে চীনের বিশেষ ট্রেড ফাইন্যান্সিং উইন্ডো ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। লেনদেনের মুদ্রা হিসেবে মার্কিন ডলার অথবা চীনা মুদ্রা রেনমিনবি (RMB) ব্যবহারের প্রস্তাব রয়েছে।
বাস্তবায়নের আর্থিক কাঠামো:
নীতিপত্র অনুযায়ী, প্রথম ধাপে বাংলাদেশ ব্যাংক ও পিপলস ব্যাংক অব চায়নার মধ্যে একটি ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তি স্বাক্ষর করতে হবে। পরবর্তীতে Bank of China, ICBC, China Construction Bank এবং Agricultural Bank of China-এর মতো চীনা ব্যাংকগুলো বিশেষ ক্রেডিট সুবিধা প্রদান করবে। বাংলাদেশের নির্বাচিত ব্যাংকগুলো কনফার্মিং ব্যাংক হিসেবে কাজ করবে। এর ফলে চীনা সরবরাহকারীরা তাৎক্ষণিক অর্থপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে পারবে এবং বাংলাদেশি শিল্প উদ্যোক্তারা দীর্ঘমেয়াদি স্বল্প ব্যয়ের অর্থায়ন সুবিধা পাবেন।
নীতিপত্রে দুটি সম্ভাব্য অর্থনৈতিক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।প্রথম পরিস্থিতিতে, যদি চীন থেকে মাসিক ১.৫ বিলিয়ন ডলার আমদানি এই স্কিমের আওতায় আসে এবং ছয় মাসের ডিফার্ড পেমেন্ট সুবিধা কার্যকর হয়, তাহলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে একসঙ্গে প্রায় ৯ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ অতিরিক্ত বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হবে।
দ্বিতীয় পরিস্থিতিতে, যদি দেশের মোট শিল্প কাঁচামাল আমদানির অন্তত ৫০ শতাংশ এই ব্যবস্থার আওতায় আনা যায়, তাহলে প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলারের কার্যকরী মূলধন সহায়তা শিল্পখাতে প্রবাহিত হতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছে।
বছরে সাশ্রয় হতে পারে ১ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত:
প্রস্তাবনায় উল্লেখ করা হয়েছে, বর্তমানে শিল্পখাতে ট্রেড ফাইন্যান্সিংয়ের কার্যকর ব্যয় ১২ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছে যায়। বিপরীতে আন্তর্জাতিক ডিফার্ড ট্রেড ফাইন্যান্সিংয়ের মাধ্যমে এ ব্যয় ৪ থেকে ৬ শতাংশে নামিয়ে আনা সম্ভব হতে পারে। সে ক্ষেত্রে শিল্প উদ্যোক্তারা ৮ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত সুদ সাশ্রয় করতে পারবেন।
যদি বছরে ১০ বিলিয়ন ডলারের শিল্প কাঁচামাল এই ব্যবস্থার আওতায় আসে, তাহলে সম্ভাব্য সুদ সাশ্রয়ের পরিমাণ দাঁড়াতে পারে ৮০০ মিলিয়ন থেকে ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় আনুমানিক ১০ হাজার থেকে ১২ হাজার ৫০০ কোটি টাকার সমান।
সরকারের সম্ভাব্য লাভ:
নীতিপত্রে বলা হয়েছে, এই ব্যবস্থা চালু হলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর তাৎক্ষণিক চাপ কমবে, শিল্প উৎপাদন ব্যয় হ্রাস পাবে, রপ্তানি সক্ষমতা বাড়বে এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। একইসঙ্গে শিল্পখাতে তারল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় উৎপাদন সম্প্রসারণ সহজ হবে এবং সরকারের কর ও ভ্যাট আদায়ও বৃদ্ধি পেতে পারে।
পাইলট প্রকল্পের প্রস্তাব:
প্রাথমিক পর্যায়ে ছয়টি খাতে পরীক্ষামূলকভাবে প্রকল্পটি চালুর সুপারিশ করা হয়েছে। খাতগুলো হলো—
গার্মেন্টস অ্যাকসেসরিজ শিল্প
স্পিনিং মিল
উইভিং মিল
ডাইং ও ফিনিশিং শিল্প
শিল্প কেমিক্যাল
শিল্প যন্ত্রপাতি
পাইলট প্রকল্পের ফলাফল মূল্যায়নের পর ধাপে ধাপে অন্যান্য শিল্পখাতে সম্প্রসারণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে বিশেষ ব্যবস্থা:
নীতিপত্রে আমদানি অপব্যবহার প্রতিরোধ, শুধুমাত্র উৎপাদনমুখী শিল্পকে অন্তর্ভুক্ত করা, বাংলাদেশ ব্যাংকের অধীনে কেন্দ্রীয় মনিটরিং সেল গঠন, ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু এবং রপ্তানি পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে ঋণযোগ্যতা নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে।
তিন বছরের রোডম্যাপ:
প্রস্তাবিত রোডম্যাপ অনুযায়ী, প্রথম ছয় মাসে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে নীতিগত আলোচনা ও চুক্তি সম্পন্ন হবে। পরবর্তী ছয় মাসে পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। ১২ থেকে ২৪ মাসের মধ্যে এটি জাতীয় পর্যায়ে সম্প্রসারণ করা হবে।
এছাড়া ২৪ থেকে ৩৬ মাসের মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান এবং আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি বহুপাক্ষিক ট্রেড ফাইন্যান্সিং প্ল্যাটফর্ম গঠনেরও সুপারিশ করা হয়েছে।
নীতিপত্রের উপসংহারে ইফতেখার হোসেন বলেন, “ব্যাক-টু-ব্যাক এলসি বাংলাদেশের প্রথম শিল্প বিপ্লবের আর্থিক ভিত্তি তৈরি করেছিল। বাংলাদেশ-চীন ডিফার্ড ট্রেড ফাইন্যান্সিং সুবিধা দেশের দ্বিতীয় প্রজন্মের শিল্পায়ন, বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা এবং রপ্তানি প্রতিযোগিতা বৃদ্ধির জন্য একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হতে পারে। তিনি এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকার, অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকদের দ্রুত উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান।


মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়েছে.