একই (পিই) পদে দীর্ঘ সময় বহাল থেকে, পছন্দের আওয়ামী লীগের ব্যক্তি/ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দিয়ে অঢেল সম্পদ অর্জন এবং জ্ঞাত আয়বহির্ভুত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে সিভিল এভিয়েশনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এএইচ এমডি নুরউদ্দিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে।
বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (সিভিল এভিয়েশন অথরিটি) অভ্যন্তরে নিয়ম-নীতি যেন উপেক্ষিত বাস্তবতা! নিয়মানুযায়ী কোন কর্মকর্তা রাজস্ব খাতে একই পদে কিংবা একই দপ্তরে তিন বছরের বেশি সময় থাকতে পারেন না। অথচ তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এ এইচ এমডি নুরউদ্দিন চৌধুরী সেই নিয়মকে উপেক্ষা করেই সাড়ে পাঁচ বছরেরও অধিককাল ধরে একই দায়িত্বে বহাল আছেন — তাও আবার অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করে!
আরও পড়ুন…প্লাস্টিক দূষণ মোকাবেলায় বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করবে জাতিসংঘ ও বিমস্টেক
সূত্র জানায়, নুরউদ্দিন পূর্ণকালীন সময়ের জন্য বেসরকারি বিমান চলাচল কর্র্তপক্ষ (বেবিচক) কর্তৃক বাস্তবায়িত হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সম্প্রসারিত ( ১ম পর্যায় ) (১ম সংশোধিত) শীর্ষক প্রকল্পে পূর্ণকালীন ‘প্রকল্প পরিচালক (PD)’ হিসেবে নিয়োগ পান। কিন্তু সেই অদৃশ্য শক্তির ক্ষমতা বলে একই সঙ্গে প্রজেক্ট ইঞ্জিনিয়ার ‘পি (PE)’ হিসাবে অতিরিক্ত দ্বায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।
প্রজেক্ট ইঞ্জিনিয়ার (PE)‘র দায়িত্ব তিনি সাড়ে পাঁচ বছরের অধিক সময় ধরে আকড়েঁ রেখেছেন ! অথচ সরকারী পরিপত্র অনুযায়ী একাধারে এতদিন একই পদে/দায়িত্বে থাকা আইনসঙ্গত নয়।
সরকারি বিধি অনুযায়ী, “যদি কোন কর্মকর্তা পূর্ণকালীন কোন পদে নিযুক্ত হন, তবে তিনি অন্য কোনো দায়িত্বে নিয়োজিত থাকতে পারবেন না। বিশেষ করে একই প্রকল্পে একাধিক দায়িত্ব গ্রহণ সম্পূর্ণভাবে বিধি বহির্ভূত।” (সূত্র: জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের পরিপত্র) কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, নুরউদ্দিন ওই একই প্রকল্পে PD ও PE — উভয় দায়িত্ব একসঙ্গে পালন করছেন, PE এর দায়িত্বেই দীর্ঘ পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে বহাল তবিয়তে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী নুর উদ্দিন চৌধুরী! অভ্যন্তরীণ সূত্র জানায়, এই ব্যবস্থা শুধু অসাংবিধানিক নয়, বরং প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নষ্টের বড় উদাহরণ।
প্রশ্ন উঠেছে— কে এই নুরউদ্দিন? কেন তাকে নিয়ম ভেঙে এত দীর্ঘ সময় একই স্থানে রাখা হচ্ছে? তার পেছনে কি অদৃশ্য কোনো প্রভাবশালী চক্র কাজ করছে? তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের নিয়োগপ্রাপ্ত ‘পি (PE)’ ছিলেন এবং এখন ও তিনি আওয়ামী ঠিকাদারী দোসরদের পুনর্বাসন এর জন্য কাজ করে যাচ্ছেন, এ কারণেই কি তাহলে নিয়ম বহির্ভূত ভাবে এই পদে বহাল রয়েছেন ?? বিশস্ত এক সূত্রে জানা গেছে, নুর উদ্দিন বিগত সময়গুলোতে আওয়ামী লীগের ঠিকাদার ছাড়া অন্য কোন ঠিকাদার বা কাউকেই কোন কাজ দিতেন না।
এখনো আতিক কনস্ট্রাকশন নামের আওয়ামী দোসর খ্যাত ঠিকাদারকে কাজ দিচ্ছেন নুর উদ্দিন। এই আতিক কনস্ট্রাকশনের মালিক আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রাপ্ত এমপি পদপ্রার্থী ছিলেন এবং পাচঁ তারকা হোটেল ইন্টার কন্টিনেন্টালের রাজনৈতিক পরিচালক ছিলেন আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে।
অভ্যন্তরীণ অনেকেই অভিযোগ করছেন, নিয়মবহির্ভূত এই নিয়োগ এবং দায়িত্ব বহাল রাখার পেছনে রয়েছে ‘উচ্চ মহলের আশীর্বাদ’। এমনকি একাধিক আবেদন ও অভিযোগ জমা পড়লেও, অজ্ঞাত কারণে তা আলোর মুখ দেখছে না। সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালা অনুযায়ী: “একই পদে বা দপ্তরে তিন বছর অতিক্রান্ত হলে কর্মকর্তা/কর্মচারীকে রোটেশনাল ভিত্তিতে বদলি করতে হবে, যা প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে চালু রয়েছে।”
তবে এই বিধান সিভিল এভিয়েশনের প্রকৌশলী এ এইচ এমডি নুরউদ্দিনের চৌধুরির ক্ষেত্রে কার্যকর হচ্ছে না কেন— সেটিই এখন মূল প্রশ্ন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, “নুরউদ্দিনের পেছনে শক্ত লবিং কাজ করছে। সে কারণে কেউ কিছু বলার সাহস পায় না।” অনেকে আশঙ্কা করছেন, অতিরিক্ত ক্ষমতা ও দীর্ঘকাল এক জায়গায় দায়িত্বে থাকা অবস্থায় দপ্তরের স্বচ্ছতা এবং প্রকল্প পরিচালনায় অনিয়মের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে।
কমিশন বাণিজ্যে বিত্তবৈভব, উচ্চপদস্থদের ‘জিম্মি’ করার অভিযোগও রয়েছে এই প্রখৌশলীর বিরুদ্ধে দফতরের অনেকেই বলেন, নুরউদ্দিন তার ঘনিষ্ঠ ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দিয়ে প্রতিটি প্রকল্পে কমিশন আদায় করে গড়ে তুলেছেন শতাধিক কোটি টাকার সাম্রাজ্য। এমনকি CAAB-এর কিছু কর্মকর্তার ভাষ্য—“তিনি এখন টাকার জোরে নিয়ম, বিধি, এবং এমনকি প্রশাসনিক উচ্চ মহলকেও বুড়ো আঙুল দেখিয়ে চলে যাচ্ছেন।” অভিযোগ রয়েছে, CAAB-এর চেয়ারম্যানসহ একাধিক কর্মকর্তা এখন তার কাছে কার্যত জিম্মি।
আরও পড়ুন…ক্ষমা পেয়ে গেছেন সাবেক আইজিপি মামুন, রাজসাক্ষী হওয়ায়
এ বিষয়ে সিভিল এভিয়েশনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কিংবা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অবস্থান জানতে চেয়ে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তারা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। সরকারি নীতিমালা অমান্য করে কোন কর্মকর্তা দীর্ঘদিন একই পদে বহাল থাকতে পারেন না — এমন নজির তৈরি হলে তা ভবিষ্যতে প্রশাসনিক কাঠামোয় অস্থিরতা ও দুর্নীতির পথ সুগম করতে পারে। তাই দ্রুত তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করার দাবি জানাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
জনগণের করের টাকায় পরিচালিত দপ্তরে একজন কর্মকর্তা যদি একাই নিয়ন্ত্রণে রাখেন পুরো প্রশাসন ও প্রকল্প — তবে প্রশ্ন উঠতেই পারে, তার এই ক্ষমতার উৎস কোথায়? প্রশাসনের ভেতরে কী এমন গোপন সমর্থন রয়েছে, যা তাকে এতদিন ধরে আইনবিরুদ্ধভাবে টিকিয়ে রেখেছে?
গণদাবি: অবিলম্বে তদন্ত হোক, অপসারণ ও বিচার নিশ্চিত করা হোক। এই ঘটনায় সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) হস্তক্ষেপ এখন সময়ের দাবি। তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নেওয়া হলে প্রশাসনিক জবাবদিহিতা ও ন্যায়বিচারের প্রতি আস্থা ভেঙে পড়বে।
চলবে… আরও তথ্যবহুল অনুসন্ধানী সংবাদ পেতে চোখ রাখুন ইবাংলা.প্রেস-এ
ইবাংলা/ আইএইচএস