যেকোনো ক্রিকেট বিশ্বকাপে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচই থাকে সবচেয়ে আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে। দক্ষিণ এশিয়ার এই দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর মুখোমুখি লড়াই থেকে প্রতিবারই বিজ্ঞাপন বাবদ আয় হয় কোটি কোটি ডলার। আর প্রতিটি বলের সঙ্গে স্পন্দিত হয় শত শত মিলিয়ন দর্শকের হৃদয়। কিন্তু বিশ্বজুড়ে ক্রিকেটপ্রেমীদের জন্য এক নজিরবিহীন হতাশা হয়ে উঠতে পারে আসন্ন আইসিসি পুরুষ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ।
৭ই ফেব্রুয়ারি থেকে ৮ই মার্চ পর্যন্ত ভারত ও শ্রীলঙ্কার যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠেয় এই টুর্নামেন্ট ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ভারত-পাকিস্তান মুখোমুখি লড়াই ছাড়াই শেষ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন দ্য স্ট্রেইটস টাইমস।
এতে আরও বলা হয়, ইতিমধ্যে বাংলাদেশ টুর্নামেন্ট থেকে নিজেদের নাম প্রত্যাহার করে নিয়েছে। কারণ, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) বাংলাদেশের অনুরোধ সত্ত্বেও তাদের ম্যাচগুলো ভারত থেকে শ্রীলঙ্কায় সরাতে রাজি হয়নি। যদিও ঢাকা স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, ভারতে খেলতে গেলে তাদের ক্রিকেটারদের জন্য ‘বাস্তব নিরাপত্তা ঝুঁকি’ রয়েছে। প্রবীণ ক্রিকেট লেখক এবং ‘নট জাস্ট ক্রিকেট: এ রিপোর্টার্স জার্নি থ্রু মডার্ন ইন্ডিয়া’ বইয়ের লেখক প্রদীপ ম্যাগাজিন বলেন, এটা ক্রিকেটের জন্য একেবারে নতুন তলানিতে নেমে যাওয়ার মতো অবস্থা। দ্য স্ট্রেইটস টাইমস’কে তিনি বলেন, সব টানাপোড়েনের মাঝেও ক্রিকেট বরাবরই সৌহার্দ্যের প্রতীক ছিল। এটাই ছিল সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক।
আরও পড়ুন…অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দাবি ১৩৫ সাংবাদিকের, স্থগিতের আহ্বান
এ বছরের জানুয়ারিতে আইপিএলের দল কলকাতা নাইট রাইডার্সকে তাদের একমাত্র বাংলাদেশি খেলোয়াড় পেসার মোস্তাফিজুর রহমানকে দল থেকে বাদ দিতে বাধ্য করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয় ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই)-এর নির্দেশে। বিসিসিআই বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ক্রীড়া নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর একটি। ভারতে ক্রিকেটের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক গুরুত্বের কারণে ক্ষমতার কেন্দ্রগুলোর সঙ্গেও সংস্থাটির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।
মোস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দেয়ার এই নির্দেশকে অনেকেই বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দুদের ওপর হামলার অভিযোগের পাল্টা প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখছেন। যে ইস্যুটি বিজেপি জোরালোভাবে তুলে ধরেছে এবং যার জেরে ভারতে, এমনকি বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশনের সামনেও বিক্ষোভ হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ক্ষুব্ধ বাংলাদেশ ঘোষণা দেয়- তাদের ক্রিকেটাররা ভারতে খেলতে যাবে না এবং আইসিসির কাছে ম্যাচগুলো শ্রীলঙ্কায় সরানোর অনুরোধ জানায়।
এমন ব্যবস্থা একেবারে নজিরবিহীন নয়। আইসিসি টুর্নামেন্টে ভারত ও পাকিস্তান প্রায়ই নিরপেক্ষ ভেন্যুতে খেলে থাকে। ২০২৫ সালের চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে খেলতে ভারত পাকিস্তানে যেতে অস্বীকৃতি জানালে শেষ পর্যন্ত সংযুক্ত আরব আমিরাতে ম্যাচ আয়োজন করা হয়। তবে এবার আইসিসি বাংলাদেশের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে জানায়, ভারতে তাদের খেলোয়াড়দের জন্য কোনো ‘বিশ্বাসযোগ্য নিরাপত্তা হুমকি’ নেই। শেষ পর্যন্ত টুর্নামেন্ট সূচিতে বাংলাদেশের জায়গায় স্কটল্যান্ডকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
এই সিদ্ধান্ত আইসিসির ওপর ভারতের আধিপত্য নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। সংস্থাটি স্বাধীন হওয়ার কথা থাকলেও, এর অনেক সিদ্ধান্তকেই ভারতের পক্ষে পক্ষপাতদুষ্ট বলে মনে করা হয়। বিশেষত যখন বিশ্ব ক্রিকেটের আনুমানিক ৮০ শতাংশ রাজস্ব আসে ভারত থেকে। ভারতের প্রভাব এতটাই ব্যাপক যে আইসিসিকে কখনো কখনো ব্যঙ্গ করে ‘ইন্ডিয়ান ক্রিকেট বোর্ড’ কিংবা ‘বিসিসিআইয়ের সম্পূর্ণ মালিকানাধীন সহযোগী
প্রতিষ্ঠান’ বলেও আখ্যা দেয়া হয়। আইসিসির ভেতরেও ভারতীয়দের প্রভাবশালী অবস্থান এই প্রশ্নকে আরও জোরালো করে। বিসিসিআইয়ের সাবেক সচিব ও ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর পুত্র জয় শাহ বর্তমানে আইসিসির চেয়ারম্যান। আর সংস্থাটির সিইও সঞ্জোগ গুপ্ত একজন ভারতীয় সম্প্রচার পেশাজীবী।
প্রদীপ ম্যাগাজিনের মতে, আইসিসির উচিত ছিল বাংলাদেশের উদ্বেগের প্রতি আরও সংবেদনশীল হওয়া। তিনি বলেন, আমার মনে হয় এখানে আরও বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত নেয়া যেত। হয়তো তারা ভাবেনি পরিস্থিতি এতটা দূর গড়াবে। কিন্তু আজকের দিনে জাতীয়তাবাদ আর উগ্র দেশপ্রেম সিদ্ধান্ত গ্রহণে যে কতটা বড় ভূমিকা রাখে, সেটাই আমরা দেখছি।
১৫ ফেব্রুয়ারি ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ না খেলার বিষয়ে পাকিস্তানের অনড় অবস্থান ক্রিকেট বিশ্বে তীব্র আলোড়ন তুলেছে। আইসিসি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার হুমকি দিয়েছে- যদিও এর বিস্তারিত এখনও স্পষ্ট নয়। পাকিস্তানকে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে কোটি কোটি ডলারের ক্ষতির মুখে পড়তে হতে পারে, এমনকি সাময়িক নিষেধাজ্ঞারও ঝুঁকি রয়েছে।
যার ফলে আইসিসির অধীনে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তাদের অংশগ্রহণ বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তবু মনে হচ্ছে, বৈশ্বিক ক্রিকেটে ভারতের প্রভাব এবং বাংলাদেশের ওপর দিল্লির প্রভাবকে চ্যালেঞ্জ জানাতে এই মূল্য দিতে প্রস্তুত পাকিস্তান- এই কৌশল শেষ পর্যন্ত কতটা কার্যকর হবে, তা ভিন্ন প্রশ্ন।
আরও পড়ুন…ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫ নবীনগর আসনে ধানের শীষের নির্বাচনী জনসভা
পাকিস্তানি লেখক নাদিম ফারুক পারাচা ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ বয়কটকে স্বাগত জানিয়ে একে ‘দন্তহীন আইসিসি এবং তার প্রভু বিসিসিআইয়ের বিরুদ্ধে বুদ্ধিদীপ্ত জবাব’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। এক্সে তিনি লিখেছেন, ‘এটা তাদের জন্য চেকমেটের মতো চাল।’
করাচির ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনস একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক মুনিস আহমারের মতে, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের বর্তমান প্রক্রিয়ার কারণেই পাকিস্তান এই সুযোগটি কাজে লাগিয়েছে। তিনি দ্য স্ট্রেইটস টাইমস’কে বলেন, বাংলাদেশ ভারতে খেলতে না যাওয়ার সিদ্ধান্তে পাকিস্তান খুশি হয়েছে। পাকিস্তান যদি তখন ভারতের বিপক্ষে খেলত, তাহলে ঢাকার কাছে ভুল বার্তা যেত।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে ঢাকা-ইসলামাবাদ সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত শীতল। একসময় একই রাষ্ট্রের অংশ থাকা এই দুই দেশ ১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে আলাদা হয়, যখন বাংলাদেশ পাকিস্তানের কাছ থেকে স্বাধীনতা অর্জন করে।
২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার আকস্মিক বিদায়ের আগ পর্যন্ত, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের তিক্ত স্মৃতি, যার সময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও সহযোগী মিলিশিয়ারা ভয়াবহ দমন অভিযান চালায়, এই সম্পর্কের ওপর ভার হয়ে ছিল। তবে পর্দার আড়ালে আইসিসি, পাকিস্তান এবং অন্যান্য অংশীজনদের মধ্যে সমাধানের চেষ্টা এখনও চলছে।
প্রদীপ ম্যাগাজিন এর মতে, ভারতে যারা পাকিস্তানকে শাস্তি দিতে চায়, কিংবা পাকিস্তানে যারা ভারতকে শাস্তি দিতে চায়, তারা সবাই শেষ পর্যন্ত এই ম্যাচটার অপেক্ষায় থাকে। এই ম্যাচ না হলে, সেটা ক্রিকেটের জন্য নিঃসন্দেহে এক বড় ক্ষতি।