বাকু, ২২ মে ২০২৬ — বৈশ্বিক আবাসন সংকট মোকাবিলা এবং টেকসই নগর উন্নয়নের নতুন দিকনির্দেশনা সামনে রেখে আজারবাইজানের রাজধানী বাকুতে শেষ হয়েছে বিশ্ব নগর ফোরামের (WUF13) ত্রয়োদশ অধিবেশন। এক সপ্তাহব্যাপী এই বৈশ্বিক সম্মেলনে ১৭৬টি দেশের ৫৭ হাজারেরও বেশি অংশগ্রহণকারী যোগ দেন, যা এটিকে ইতিহাসের বৃহত্তম বিশ্ব নগর ফোরামে পরিণত করেছে।
জাতিসংঘের আবাসন ও টেকসই নগরায়ন সংস্থা UN-Habitat এবং আজারবাইজান সরকারের যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত এবারের ফোরামের প্রতিপাদ্য ছিল “বিশ্বের জন্য আবাসন: নিরাপদ ও স্থিতিস্থাপক শহর এবং সম্প্রদায়।
ফোরামের সমাপনী দিনে উপস্থাপন করা হয় “বাকু কল টু অ্যাকশন” নামে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীজন-নেতৃত্বাধীন নথি, যেখানে আবাসন নিরাপত্তা, সাশ্রয়ী বাসস্থান এবং জলবায়ু-সহনশীল নগর উন্নয়নের জন্য দ্রুত ও সমন্বিত বৈশ্বিক পদক্ষেপের আহ্বান জানানো হয়েছে।
এক সপ্তাহজুড়ে অনুষ্ঠিত ফোরামে ৫৭৯টি অধিবেশন, ৩৭০টিরও বেশি অংশীদার-পরিচালিত অনুষ্ঠান এবং ২৬০টি প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। এতে অংশ নেন ১১ জন রাষ্ট্রপ্রধান, ৮৮ জন মন্ত্রী, ৭৬ জন উপমন্ত্রী এবং ১৩০ জন মেয়রসহ আন্তর্জাতিক সংস্থা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাবিদ, নাগরিক সমাজ ও তৃণমূল সংগঠনের প্রতিনিধিরা। অংশগ্রহণকারীদের ৫৫ শতাংশেরও বেশি ছিলেন নারী ও মেয়ে।
আজারবাইজানের নগর পরিকল্পনা ও স্থাপত্য বিষয়ক রাষ্ট্রীয় কমিটির চেয়ারম্যান এবং WUF13-এর জাতীয় সমন্বয়কারী Anar Guliyev বলেন, “WUF13 শুধু বৃহত্তম ফোরাম হিসেবেই নয়, বরং আবাসনকে বৈশ্বিক রাজনৈতিক এজেন্ডার কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনার একটি ঐতিহাসিক মঞ্চ হিসেবেও স্মরণীয় হয়ে থাকবে।”
ফোরামে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল বৈশ্বিক আবাসন সংকট, অনানুষ্ঠানিক বসতি উন্নয়ন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, নগর অর্থায়ন, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি এবং স্থিতিস্থাপক নগর পরিকল্পনা।
আরও পড়ুন…WUF13-এর আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু
বক্তারা সতর্ক করেন, বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩০ কোটি মানুষ এখনও অপর্যাপ্ত আবাসন ব্যবস্থায় বসবাস করছে এবং জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈষম্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
Anacláudia Rossbach বলেন, “আবাসনের ভবিষ্যতের জন্য আমরা এক নির্ণায়ক মুহূর্তে দাঁড়িয়ে আছি। আগামী দশককে অবশ্যই বাস্তবায়ন, কার্যকর উদ্যোগ এবং মানুষের জীবনে দৃশ্যমান পরিবর্তনের দশক হতে হবে।
ফোরামে আবাসন ও জলবায়ুর সম্পর্ক নিয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। বিভিন্ন অধিবেশনে স্বল্প-কার্বন নির্মাণ, প্রকৃতি-ভিত্তিক সমাধান, বন্যা ও তাপপ্রবাহ মোকাবিলায় নগর পরিকল্পনা এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সুরক্ষার কৌশল নিয়ে আলোচনা হয়।
এছাড়া, অনানুষ্ঠানিক বসতি ও সুবিধাবঞ্চিত এলাকাগুলোর উন্নয়নে সম্প্রদায়ভিত্তিক অংশগ্রহণ, নমনীয় ভূমি ব্যবস্থাপনা এবং স্থানীয় নেতৃত্ব শক্তিশালী করার ওপর জোর দেওয়া হয়। সরকার, উন্নয়ন ব্যাংক ও বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা সাশ্রয়ী আবাসনের জন্য নতুন অর্থায়ন মডেল এবং বিনিয়োগ কাঠামো নিয়েও আলোচনা করেন।
ফোরামের সমাপনী অনুষ্ঠানে জাতিসংঘের উপ-মহাসচিব Amina J. Mohammed বলেন, “২০৩০ সালের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের সময়। বিশেষ করে এসডিজি-১১ এবং সবার জন্য পর্যাপ্ত আবাসনের লক্ষ্য বাস্তবায়নে আমাদের গতি বাড়াতে হবে।”
WUF13-এর সমাপ্তির মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে পরবর্তী বিশ্ব নগর ফোরাম World Urban Forum 14 আয়োজনের দায়িত্ব মেক্সিকোর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। ২০২৮ সালে অনুষ্ঠিত হবে WUF14।
২০০১ সালে জাতিসংঘের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত বিশ্ব নগর ফোরাম টেকসই নগরায়ন নিয়ে বিশ্বের প্রধান বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে বিবেচিত হয়। এর প্রথম অধিবেশন ২০০২ সালে কেনিয়ার নাইরোবিতে অনুষ্ঠিত হয়েছিল।