ফিজিতে ঐতিহ্যবাহী স্বাগত অনুষ্ঠানে জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় ১.৫ ডিগ্রি লক্ষ্যমাত্রা ধরে রাখার আহ্বান
ইবাংলা.প্রেস | নিজস্ব প্রতিবেদক | ০৬ অক্টোবর ২০২৬
ফিজির দাভেতা গোল্ডেন বলরুমে সোমবার (৫ অক্টোবর) অনুষ্ঠিত ঐতিহ্যবাহী স্বাগত অনুষ্ঠানে জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় বৈশ্বিক উদ্যোগ জোরদার, ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বৃদ্ধির সীমা ধরে রাখা এবং জলবায়ু অর্থায়ন ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
ফিজির নাদির ঐতিহ্যবাহী ভূমির রক্ষকদের পক্ষ থেকে অতিথিদের স্বাগত জানিয়ে অনুষ্ঠানের বক্তা বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতাদের ফিজিতে স্বাগত জানানো হয়েছে দেশের প্রাচীনতম ঐতিহ্য ও প্রটোকল অনুসরণ করে। অনুষ্ঠানে রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান, মন্ত্রী, রাষ্ট্রদূত, প্রতিনিধিদলের প্রধান, ধর্মীয় ও সামাজিক নেতৃবৃন্দ, তরুণ এবং গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
আরও পড়ুন…ডেঙ্গুতে প্রাণ গেল আরও ১০ জনের
‘নি সা বুলা ভিনাকা’ বলে অতিথিদের শুভেচ্ছা জানিয়ে তিনি বলেন, ফিজির ঐতিহ্যবাহী স্বাগত অনুষ্ঠানের প্রতিটি আনুষ্ঠানিকতার গভীর অর্থ রয়েছে। অতিথিদের সামনে পরিবেশিত ‘ইয়াকোনা’ বা ‘কাভা’ শুধু উপহার নয়; এর মাধ্যমে আগত অতিথি নিজেকে স্বাগতিকদের কাছে সমর্পণ করেন এবং স্বাগতিকরা তাকে গ্রহণ করেন।
তিনি বলেন, কাভা গ্রহণের পর একজন আগন্তুক অতিথিতে পরিণত হন। আর অতিথি হওয়ার অর্থ হলো স্বাগতিক ও অতিথির মধ্যে পারস্পরিক দায়িত্ব ও যত্নের সম্পর্ক তৈরি হওয়া।
বক্তব্যে তিনি বলেন, এই সম্পর্কই প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের সঙ্গে বিশ্বের সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। ফিজিতে ‘বুলা’ শব্দের অর্থ জীবন। প্রতিবার এই শব্দের মাধ্যমে একে অপরের জন্য জীবনের শুভকামনা জানানো হয়। জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে চলতি সপ্তাহের আলোচনার মূল বিষয়ও হওয়া উচিত জীবন—কোনো বিমূর্ত ধারণা, ধারা বা আলোচনার বন্ধনী নয়।
তিনি বলেন, প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বাস্তবতা দূর থেকে পুরোপুরি বোঝা সম্ভব নয়। তাই বিশ্বনেতাদের এই অঞ্চলে আসার আহ্বান জানানো হয়েছে।
তুভালুর উপকূলে জলবায়ু সংকট কোনো ভবিষ্যৎ পূর্বাভাস নয়; সেখানে জোয়ার বাড়ছে, কৃষিজমিতে লবণাক্ততা ঢুকছে এবং একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে দাঁড়িয়েছে—একটি জনগোষ্ঠী আর কতদিন তার নিজ ভূমিতে টিকে থাকতে পারবে।
বক্তা বলেন, প্রশান্ত মহাসাগরীয় সমাজে ভূমি, সমুদ্র ও মানুষকে আলাদা করে দেখা হয় না। এসব মিলেই ‘ভানুয়া’। এর একটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে পুরো ব্যবস্থাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই দৃষ্টিভঙ্গিই প্রশান্ত মহাসাগরীয় সমাজগুলোকে টিকে থাকতে সহায়তা করেছে।
তিনি আরও বলেন, ফিজির পূর্বপুরুষরা আকাশের রং, জোয়ার-ভাটার পরিবর্তন, গাছের ফুল ফোটা এবং পাখির চলাচল পর্যবেক্ষণ করে আবহাওয়া ও প্রকৃতির সংকেত বুঝতেন।
কখন বীজ বপন করতে হবে, কখন মাছ ধরতে হবে কিংবা কখন উঁচু স্থানে সরে যেতে হবে—এসব সিদ্ধান্ত নিতে প্রকৃতির প্রতি গভীর মনোযোগ গুরুত্বপূর্ণ ছিল।বিপদের সময় ‘দাভুই’ নামের শঙ্খধ্বনি বাজানো হতো বলেও উল্লেখ করেন তিনি। এর বার্তা ছিল—একত্রিত হও এবং সতর্ক হও।
তিনি বলেন, এখন প্রশান্ত মহাসাগর নিজেই সেই সতর্কবার্তা দিচ্ছে। আর এই সতর্কবার্তা শুধু প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপদেশগুলোর জন্য নয়, পুরো বিশ্বের জন্য।
বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ অঞ্চলজুড়ে বিস্তৃত প্রশান্ত মহাসাগর বৈশ্বিক আবহাওয়ার ওপর বড় প্রভাব ফেলে উল্লেখ করে বক্তা বলেন, সমুদ্রের উষ্ণতা বৃদ্ধি এবং এল নিনোর মতো জলবায়ু পরিস্থিতির প্রভাব শুধু প্রশান্ত মহাসাগরের প্রবালপ্রাচীর বা দ্বীপগুলোতে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর প্রভাব বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের বৃষ্টিপাত, কৃষি, বন্যা, খরা, দাবানল এবং খাদ্যের দামের ওপরও পড়ে।তিনি বলেন, ফিজির সমুদ্র ও জলবায়ুতে যে পরিবর্তন শুরু হচ্ছে, তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত বিশ্বের অন্য দেশগুলোর মানুষের জীবনেও পৌঁছে যায়।
বক্তা বলেন, প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলোকে সহানুভূতির দৃষ্টিতে দেখার প্রয়োজন নেই; বরং ভবিষ্যতের বৈশ্বিক ঝুঁকির পূর্বাভাস হিসেবে তাদের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে হবে।
কারণ সামনের সারিতে থাকা জনগোষ্ঠীগুলোর কাছেই ঝুঁকিগুলো প্রথম দৃশ্যমান হয়—সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, উষ্ণ সমুদ্র, পানির সংকট এবং খাদ্য উৎপাদনে ব্যর্থতা।
তিনি বলেন, এসব শুধু প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ঝুঁকি নয়, এগুলো মানবজাতির অভিন্ন ঝুঁকি। তবে জলবায়ু ও সমুদ্রের সংঘাত, সীমিত ভূমি এবং প্রকৃতির ওপর গভীর নির্ভরতার কারণে প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপগুলোতে এসব সংকট সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে।
অনুষ্ঠানে অতিথি ও স্বাগতিকের পারস্পরিক দায়িত্বের প্রসঙ্গ তুলে ধরে বক্তা বলেন, এর চেয়েও বড় সত্য হলো—পৃথিবীতে আমরা সবাই অতিথি। কেউ পৃথিবীর মালিক নয় এবং পৃথিবী ছেড়ে যাওয়ার সুযোগও কারও নেই।
তিনি বলেন, দ্বীপ হোক বা মহাদেশ, ছোট দেশ হোক বা বড় দেশ—সবাই একই সমুদ্র, একই আকাশ এবং একই পরিণতির সঙ্গে যুক্ত। একটি দ্বীপদেশের পক্ষ থেকে ‘কেউই একা কোনো দ্বীপ নয়’—এ কথা বলা হয়তো অদ্ভুত শোনাতে পারে, কিন্তু বাস্তবতা এটাই।
বক্তা বলেন, প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বার্তা অত্যন্ত সরল—সময় থাকতে সতর্ক সংকেতকে গুরুত্ব দিতে হবে। ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বৃদ্ধির সীমা নাগালের মধ্যে রাখতে হবে, জলবায়ু অর্থায়নকে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে দিতে হবে এবং জলবায়ু ব্যবস্থায় সমুদ্রের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কারণে আন্তর্জাতিক আলোচনার টেবিলে সমুদ্রকে যথাযথ গুরুত্ব দিতে হবে।
চলতি সপ্তাহের আলোচনায় ‘তালানোয়ার চেতনায়অর্থাৎ উন্মুক্ত, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সৎ সংলাপের মাধ্যমে—এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়। দোষারোপের পরিবর্তে মনোযোগ দিয়ে একে অপরের কথা শোনা এবং সাধারণ মানুষের কল্যাণে সমাধান খোঁজার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে বক্তা বলেন, ঐতিহ্যবাহী স্বাগত অনুষ্ঠান শেষ হলেও আলোচনা অব্যাহত থাকবে। অতিথিদের ফিজির ‘ভানুয়া’র সুরক্ষায় স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন, তারা এখন শুধু অতিথি নন, পরিবারের অংশ।


মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়েছে.