ট্রলারডুবিতে নিখোঁজের ৫৪ বছর পর বাড়ি ফিরলেন জেলে

ইবাংলা.প্রেস | সৈয়দা তাজনাহার কাজল | ১৩ মে ২০২৬

আমাদের অনেক পেশার মধ্যে মাছ ধরাও একটি।মাছ ধরতে সমুদ্রে গিয়ে উত্তাল ঢেউয়ের তোড়ে ডুবে যায় ট্রলার। অনেকে বেঁচে ফিরলেও জেলে ছৈয়দ আহাম্মদ ফেরেননি। সবাই ধরে নিয়েছিলেন, তিনি আর বেঁচে নেই। এ ঘটনার ৫৪ বছর পেরিয়ে গেছে।

এর মধ্যে দুনিয়া ছেড়েছেন আহাম্মদের মা, বাবা, স্ত্রীসহ অনেক স্বজন। গ্রামের অনেকে ভুলে গেছেন তাঁর মুখ। কিন্তু সবাইকে অবাক করে বাড়ি ফিরে এসেছেন ছৈয়দ আহাম্মদ। দীর্ঘ অর্ধশতাব্দী পর তাঁর এই ফিরে আসার ঘটনা অলৌকিক মনে হচ্ছে গ্রামবাসীর কাছে। তাঁকে দেখতে ভিড় করছে লোকজন। সবাই তাঁর কাছে হারিয়ে যাওয়া ও ফিরে আসার গল্প শুনতে চাইছেন।

ছৈয়দ আহাম্মদের বাড়ি নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলা পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের চর কৈলাস গ্রামে। তিনি এই গ্রামের প্রয়াত ধন মিয়ার ছেলে। তাঁর বয়স এখন ৮৩ বছর। বয়সের ভারে ন্যুব্জ। একমাত্র ছেলে আকরাম হোসেনের বয়সও পঞ্চাশের ঘরে। বাবা দেখতে কেমন, তা তাঁর স্মৃতিতে ছিল না।

কারণ, আহাম্মদ যখন ট্রলারে কাজ করার জন্য বাড়ি ছাড়েন, তখন তিনি তরুণ। বাড়িতে স্ত্রী ছামনা খাতুন আর চার মাস বয়সী ছেলে আকরামকে ফেলে গিয়েছিলেন। এখন সে হিসাবে প্রথমবারের মতো বাবাকে দেখলেন আকরাম।

ছৈয়দ আহাম্মদের সৎভাই আবুল খায়েরসহ গ্রামের কয়েকজন প্রবীণ তাঁকে চিনতে পেরেছেন। বর্তমানে সেই ভাইয়ের বাসায় রয়েছেন তিনি। হারিয়ে যাওয়ার ঘটনার বর্ণনায় ছৈয়দ আহাম্মদ জানান, যখন ঝড় শুরু হয়, তখন তাদের ট্রলারটি কক্সবাজারের কুতুবদিয়া এলাকায় ছিল। সেখানেই তা ডুবে যায়।

সেদিন ট্রলারে থাকা অন্যদের পরিণতি কী হয়েছিল, সেসব কিছুই মনে নেই। শুধু মনে আছে, দীর্ঘ সময় সাগরে ভেসে ছিলেন আহাম্মদ। ট্রলারডুবির পর কোনোভাবে খড়কুটো আঁকড়ে ভেসে ছিলেন।

আরও পড়ুন…মা সন্তানের প্রথম শিক্ষক: সমাজকল্যাণ মন্ত্রী

একপর্যায়ে ভারতীয় নৌবাহিনী তাঁকে উদ্ধার করে। সে দেশেই তাঁর চিকিৎসা হয়। পরে সেখান থেকে ভারতের উত্তরপ্রদেশের আগ্রার তাজমহল এলাকায় চলে যান আহাম্মদ। দেশে ফেরা পর্যন্ত সেখানেই কেটেছে তাঁর দিন।

আহাম্মদের দাবি, ভারতীয় নাগরিকত্ব ও পাসপোর্ট পেয়েছিলেন তিনি। একদিন হঠাৎ ছেলেকে স্বপ্নে দেখতে পান। এরপর দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নেন। ভারতীয় পাসপোর্ট নিয়েই তিনি দেশে আসার চেষ্টা করছিলেন।

কিন্তু সব কাগজপত্র চুরি হয়ে যায়। পরে যশোর সীমান্তে এসে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে নিজের পরিস্থিতির কথা জানান। আহাম্মদকে বাংলাদেশে আসতে সহায়তা করে তারা। এরপর ঢাকা হয়ে নোয়াখালী এবং পরে সেখান থেকে হাতিয়ায় পৌঁছান। লোকজনের কাছে শুনে শুনে গত ৫ মে দুপুরে নিজের বাড়ি পৌঁছান।

গ্রামে ঢুকে স্থানীয় লোকজনকে ছেলে ও ভাইয়ের পরিচয় দেন আহাম্মদ। সেই সঙ্গে দেন নিজের পরিচয়। শুরুতে ছেলেসহ স্থানীয়রা তাঁকে চিনতে পারেননি। পরে তাঁর সহকর্মী মুন্সি সারেং, চাচাতো ভাই গেদু মিয়া, সৎভাই আবুল খায়েরসহ কয়েকজন প্রবীণ তাঁকে শনাক্ত করেন।

খবর ছড়িয়ে পড়তেই উৎসুক মানুষের ঢল নামে আহাম্মদের বাড়িতে।স্থানীয় বাসিন্দা আলফাজ বলেন, ‘এত বছর পর আল্লাহ তাঁকে জীবিত অবস্থায় পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিয়েছেন, এটা আমাদের জন্যও আনন্দের বিষয়।

মানুষটা যেন জীবনের শেষ সময়ে আপনজনদের সান্নিধ্য পায়, এটাই চাই।দীর্ঘ সময় ভারতে থাকায় মাতৃভাষাও অনেকখানি ভুলে গেছেন ছৈয়দ আহাম্মদ। বেশির ভাগ কথা হিন্দিতে বলেন। তিনি জানান, ৫৪ বছরের মধ্যে বেশির ভাগ সময়ই আজমির শরিফে কাটিয়েছেন।

তাঁর সৎভাই আবুল খায়ের বলেন, ‘ভাই যখন নিখোঁজ হন, তখন আমার বয়স ১০ থেকে ১১ বছর। তখন আমার ভাতিজা আকরামের বয়স কয়েক মাস। দীর্ঘ সময় ফিরে না আসায় ধরে নিয়েছিলাম, তিনি মারা গেছেন।

এত বছর পর ভাইকে ফিরে পাব, কোনোদিন ভাবিনি। তাঁর কথা শুনে অনেক স্মৃতি মনে পড়ছে। মনে হচ্ছে এটা কল্পনা! জীবনে প্রথমবার বাবাকে পেয়ে খুশি আকরাম হোসেন। তিনি বলেন, ‘জন্মের পর কখনও বাবাকে দেখিনি। তাঁর ফিরে আসার ঘটনা বিশ্বাসই হচ্ছে না।’

এদিকে বাবাকে নিজের বাড়িতে রাখতে পারছেন না বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। আকরামের দাবি, তাঁর চাচাতো ভাইয়েরা ছৈয়দ আহাম্মদকে নিজেদের কাছে নিয়ে গেছেন। আকরামের কাছে আসতে দিচ্ছেন না। ছৈয়দ আহাম্মদের সঙ্গে থাকা অর্থ নিয়েও সৃষ্টি হয়েছে বিবাদ। এসব ঘটনায় হাতিয়া থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন তিনি।

হাতিয়া থানার ওসি কবির হোসেন বলেন, ৫৪ বছর পর ফিরে আসা ছৈয়দ আহাম্মদকে নিয়ে তাঁর ছেলে একটি জিডি করেছেন। বিষয়টি আসলে পারিবারিক। পরিবার চাইলে পুলিশ আইনগত সহায়তা দেবে।

ইবাংলা বাএ

জেলেপরফিরলেনবাড়ি