ফিজিতে শেষ হলো প্রি-কপ৩১, আনতালিয়া কপ৩১-এর পথে প্রশান্ত মহাসাগরের বার্তা
ইবাংলা.প্রেস | নিজস্ব প্রতিবেদক | ০৮ অক্টোবর ২০২৬
প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অগ্রাধিকারকে সামনে রেখে ফিজিতে অনুষ্ঠিত চার দিনের প্রি-কপ বৈঠকের সমাপ্তি হয়েছে। আগামী মাসে তুরস্কের আনতালিয়ায় অনুষ্ঠিতব্য কপ৩১ জলবায়ু সম্মেলনের আগে এই বৈঠকে জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় অর্থায়ন, জ্বালানি নিরাপত্তা, বিদ্যুতায়ন, জলবায়ু সহনশীলতা এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানি রূপান্তরের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
প্রি-কপের চার দিনে বিশ্বের ১০০টিরও বেশি দেশ থেকে প্রায় ৪ হাজার মানুষ অংশ নেন। বৈঠকে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় পরিকল্পনা, বাস্তব উদ্যোগ এবং নতুন ঘোষণা তুলে ধরেন।
বৈঠকের মূল আলোচনায় ছিল বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমিত রাখার লক্ষ্য, জলবায়ু আলোচনায় সমুদ্র ও জলবায়ুর আন্তঃসম্পর্ককে আরও গুরুত্ব দেওয়া এবং ঝুঁকিপূর্ণ দেশ ও জনগোষ্ঠীর কাছে দ্রুত জলবায়ু অর্থায়ন পৌঁছে দেওয়া।
আরও পড়ুন…অক্টোবরে আরও ভয়ংকর ডেঙ্গু, তিনদিনে ২৭ জনের মৃত্যু
সমাপনী দিনে ফিজির মন্ত্রী লিন্ডা তাবুয়া, অস্ট্রেলিয়ার মন্ত্রী ক্রিস বোয়েন, কপ৩১-এর প্রেসিডেন্ট-নির্বাচিত তুরস্কের মন্ত্রী মুরাত কুরুম এবং জাতিসংঘের জলবায়ু বিষয়ক নির্বাহী সচিব সাইমন স্টিয়েল যৌথ সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন।
ফিজির মন্ত্রী লিন্ডা তাবুয়া বলেন, প্রি-কপ থেকে অর্জিত অনেক সাফল্যের পেছনে রয়েছে স্থানীয় ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জ্ঞান, ঐতিহ্য এবং জলবায়ু বিজ্ঞানের সমন্বিত প্রয়োগ। তবে কাজ এখনো শেষ হয়নি।
তিনি বলেন, আনতালিয়ায় কপ৩১ সম্মেলনে ১ দশমিক ৫ ডিগ্রির লক্ষ্যকে নাগালের মধ্যে রাখা, যাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন তাদের হাতে জলবায়ু অর্থায়ন পৌঁছে দেওয়া এবং জলবায়ু এজেন্ডায় সমুদ্রকে তার যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া—এই তিনটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
কপ৩১-এর প্রেসিডেন্ট-নির্বাচিত মুরাত কুরুম বলেন, প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলকে প্রি-কপের স্থান হিসেবে বেছে নেওয়া ছিল একটি সচেতন সিদ্ধান্ত। কারণ এই অঞ্চল জলবায়ু সংকটের সম্মুখসারিতে রয়েছে।
তিনি বলেন, তুভালু সফরে গিয়ে সেখানকার মানুষের অভিজ্ঞতা সরাসরি শোনা হয়েছে এবং জলবায়ু সংকটের বাস্তব প্রভাব প্রত্যক্ষ করা হয়েছে। তুভালু এই সংকটে প্রায় কোনো অবদান রাখেনি, অথচ দেশটি অস্তিত্বের সংকটের মুখোমুখি এবং সবচেয়ে বেশি মূল্য দিচ্ছে।
মুরাত কুরুম বলেন, বিজ্ঞান স্পষ্টভাবে সতর্ক করছে যে ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের লক্ষ্য এখন ঝুঁকির মুখে। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য আর এক মিনিট বা এক দিনও নষ্ট করার সুযোগ নেই। এটি শুধু জলবায়ু নীতি নয়, বরং সংস্কৃতি, ইতিহাস, স্মৃতি, মাতৃভূমি ও মানুষের অস্তিত্ব রক্ষার বিষয়।
অস্ট্রেলিয়ার মন্ত্রী এবং কপ৩১-এর আলোচনাপ্রক্রিয়ার প্রেসিডেন্ট ক্রিস বোয়েন বলেন, এক বছর আগে মুরাত কুরুমের সঙ্গে কপ৩১-এর এই নতুন অংশীদারত্বের পরিকল্পনা করার সময় থেকেই তারা প্রি-কপকে কপ৩১-এর জন্য সবচেয়ে কার্যকর প্রস্তুতিমঞ্চ হিসেবে গড়ে তোলার বিষয়ে একমত ছিলেন।
তিনি বলেন, বহু বছর ধরে কপ সম্মেলনে যাদের কণ্ঠস্বর যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি, বিশেষ করে ক্ষুদ্র দ্বীপ উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোর কণ্ঠস্বরকে সামনে আনার সুযোগ হিসেবে প্রি-কপকে ব্যবহার করা হয়েছে।
জাতিসংঘের জলবায়ু বিষয়ক নির্বাহী সচিব সাইমন স্টিয়েল বলেন, পুরো সপ্তাহজুড়ে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল সংকটের মুখে দৃঢ়তা, উদ্ভাবন, সহযোগিতা ও বাস্তবসম্মত সমাধানের উদাহরণ দেখিয়েছে। কপ৩১ সফল করতে এমন মানসিকতাই প্রয়োজন।
তিনি বলেন, কপ৩১-এর অন্যতম প্রধান কাজ হবে প্রতিশ্রুতিকে বাস্তব ফলাফলে রূপান্তর করা। এর জন্য জলবায়ু অর্থায়ন বাড়ানো, দ্রুততর করা এবং সাশ্রয়ী অর্থায়নে আরও বিস্তৃত জনগোষ্ঠীর প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
প্রি-কপের শেষ দিনে অস্ট্রেলিয়ার মন্ত্রী ক্রিস বোয়েন ‘গ্লোবাল রুফটপ সোলার প্লেজ’ উদ্যোগের ঘোষণা দেন। অস্ট্রেলিয়া এই উদ্যোগে প্রথম দেশ হিসেবে যুক্ত হয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে বাড়ির ছাদে ৩০ কোটি সৌর প্যানেল স্থাপনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ায় ইতোমধ্যে প্রতি তিনজন মানুষের একজনের বাড়িতে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা রয়েছে এবং দেশটিতে পাঁচ লাখের বেশি ব্যাটারি স্থাপন করা হয়েছে।ক্রিস বোয়েন বলেন, মানুষ একই সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও ব্যবহারকারী হয়ে উঠছে। এতে পরিবার ও বিদ্যুৎব্যবস্থা উভয়ই আরও নিরাপদ হচ্ছে এবং সামগ্রিকভাবে সবাই লাভবান হচ্ছে।
প্রি-কপে জলবায়ু অর্থায়নও গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় ছিল। অস্ট্রেলিয়া ‘অ্যাকসেস টু ফাইন্যান্স স্টেটমেন্ট অ্যান্ড অ্যাকশন প্ল্যান’ চালু করেছে। এর লক্ষ্য জলবায়ু অর্থায়নকে আরও দ্রুত, সহজ এবং সহজলভ্য করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর কাছে অর্থ পৌঁছানোর পথে বিদ্যমান বাধা কমানো।
প্যারিস চুক্তির পর থেকে প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলোর জন্য ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি জলবায়ু অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও এর মধ্যে ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি এখনো ছাড় করা হয়নি।
প্রি-কপে তাই শুধু নতুন প্রতিশ্রুতি নয়, বিদ্যমান প্রতিশ্রুত অর্থ বাস্তবে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।জলবায়ু আলোচনায় সমুদ্রের গুরুত্ব বাড়ানোর বিষয়টিও প্রি-কপে বিশেষভাবে উঠে এসেছে।
সমুদ্রবিষয়ক জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূত পিটার থমসন বলেন, কপ৩১-এর সহ-সভাপতিদের নির্ধারিত প্রশান্ত মহাসাগরীয় অংশীদারত্বের পাঁচটি স্তম্ভের একটি হলো সমুদ্র ও জলবায়ুর আন্তঃসম্পর্ককে গুরুত্ব দেওয়া।
তুরস্ক আনতালিয়া ওশান ডিক্লারেশন বা ‘আনতালিয়া সমুদ্র ঘোষণা’ এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।তিনি বলেন, সমুদ্র পৃথিবীর জলবায়ু নিয়ন্ত্রণে প্রধান ভূমিকা পালন করে। তাই ভবিষ্যতের জলবায়ু আলোচনায় সমুদ্রকে আর পেছনের সারিতে রাখা যাবে না।
ফিজির ভূমি ও খনিজ সম্পদবিষয়ক মন্ত্রী ফিলিমোনি ভোসারোগো বলেন, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অতিরিক্ত তাপ শোষণকারী এবং সবচেয়ে বড় সক্রিয় কার্বন ভাণ্ডারকে বাদ দিয়ে জলবায়ু কাঠামো কল্পনা করা কঠিন। অথচ বাস্তবে সমুদ্রকে অনেকটা সেভাবেই উপেক্ষা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, মানুষের নিঃসৃত কার্বন ডাই-অক্সাইডের প্রায় এক-চতুর্থাংশ সমুদ্র শোষণ করেছে এবং মানুষের কর্মকাণ্ডে আটকে পড়া অতিরিক্ত তাপের ৯০ শতাংশেরও বেশি সমুদ্র গ্রহণ করেছে।
ফলে পৃথিবী বর্তমানে যতটা উষ্ণ হওয়ার কথা ছিল, তার চেয়ে কম উষ্ণ রয়েছে। কিন্তু এই সেবা দিতে গিয়ে সমুদ্রের নিজস্ব স্বাস্থ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।সমাপনী বক্তব্যে ফিজির মন্ত্রী লিন্ডা তাবুয়া বলেন, প্রি-কপ কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে না। এর প্রকৃত মূল্য নির্ধারিত হবে আনতালিয়ায় পরবর্তী সময়ে কী ঘটে তার মাধ্যমে।
তিনি বলেন, প্রি-কপে হওয়া আলোচনা কপ৩১-এর সিদ্ধান্তকে কতটা প্রভাবিত করে, নতুন জাতীয় জলবায়ু পরিকল্পনাগুলো ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সীমা বজায় রাখার লক্ষ্যের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, জলবায়ু অর্থায়ন কত দ্রুত ও কার্যকরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে এবং এসব পদক্ষেপ জলবায়ু সংকটে আক্রান্ত কোটি কোটি মানুষের জীবনে কতটা বাস্তব পরিবর্তন আনে—সেটিই হবে সাফল্যের আসল মাপকাঠি।
অস্ট্রেলিয়ার মন্ত্রী ক্রিস বোয়েন বলেন, তিনি ও মুরাত কুরুম কপ৩১-এর জন্য সর্বোত্তম প্রস্তুতিমঞ্চ তৈরির লক্ষ্যেই প্রি-কপ আয়োজন করেছেন। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র দ্বীপ উন্নয়নশীল রাষ্ট্রগুলোর বিষয়গুলোকে কপের মূল আলোচনায় আরও গুরুত্ব দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।
তুভালুর মন্ত্রী মাইনা তালিয়া বলেন, ৬ অক্টোবর গৃহীত ঘোষণার সঙ্গে কপ৩১-এর আগে অন্যান্য দেশকে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। বৈশ্বিক জলবায়ু কার্যক্রম ও বাস্তবায়ন এগিয়ে নিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ পৃথিবী গড়ে তুলতে তিনি সব পক্ষকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান।
তুভালুর ঘোষণায় বৈশ্বিক তরুণ সমাজ, আদিবাসী জনগোষ্ঠী ও স্থানীয় সম্প্রদায়ের নেতৃত্ব ও ভূমিকার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে সমুদ্রের উষ্ণতা বৃদ্ধি, অম্লতা বৃদ্ধি এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির মতো দ্রুততর সংকটের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রি-কপের সমাপ্তিতে প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলোর পক্ষ থেকে স্পষ্ট বার্তা এসেছে—জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি এখন প্রয়োজন দ্রুত বাস্তবায়ন, পর্যাপ্ত অর্থায়ন এবং ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের লক্ষ্য রক্ষায় কার্যকর বৈশ্বিক পদক্ষেপ।ফিজিতে প্রি-কপের পর এখন সবার নজর তুরস্কের আনতালিয়ার দিকে, যেখানে আগামী মাসে অনুষ্ঠিত হবে কপ৩১ জলবায়ু সম্মেলন।


মন্তব্যসমূহ বন্ধ করা হয়েছে.